কাল খুলছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান , মানতে হবে ২০ নির্দেশনা

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ কমে যাওয়ায় সরকারের জারি করা ১১ দফা বিধি-নিষেধ মঙ্গলবার থেকে আর থাকছে না। যার অর্থ এদিন থেকে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরছে দেশ। গণপরিবহন চলবে আগের মতো, রেস্তোরাঁয় বসার ক্ষেত্রে থাকবে না কোনো শর্ত, বাধা নেই উন্মুক্ত স্থানে সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রেও। তবে মাস্ক পরাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে।

এদিকে, করোনার কারণে দ্বিতীয় দফায় এক মাস বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার খুলছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সশরীরে শ্রেণিকক্ষে অংশ নেবে শিক্ষার্থীরা। আর ১২ বছরের ঊর্ধ্বে যেসব শিক্ষার্থী করোনা টিকা নিয়েছে, তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারবে। অবশ্য প্রাথমিকের ছুটি ১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানোয় এসব বিদ্যালয় খুলবে আগামী ২ মার্চ। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কীভাবে চলবে এ বিষয়ে ২০ দফা নির্দেশনা জারি করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)।

 

গত নভেম্বর থেকে করোনার নতুন ধরন ওমিক্রন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ডিসেম্বরে বাংলাদেশেও ওমিক্রন আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। এরপর দিন দিন সংক্রমণ বাড়তে থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে গত ৪ জানুয়ারি ১৫ দফা নির্দেশনা জারি করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এতে সব ধরনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জনসমাগমে নিরুৎসাহিত করা হয়।

আর ১৩ জানুয়ারি জারি করা বিধি নিষেধে উন্মুক্ত স্থানে সব ধরনের জনসমাবেশ নিষেধ, রেস্তোরাঁয় বসে খাবার গ্রহণে টিকার সনদের বাধ্যবাধকতা, অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলাচলসহ ১১টি বিধিনিষেধ জারি করে সরকার। এছাড়াও গত ২৪ জানুয়ারি থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্ধেক জনবল নিয়ে সরকারি-বেসরকারি অফিস পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছিল সরকার। তবে পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় বিধিনিষেধের মেয়াদ ২১ ফেব্রুয়ারি রাত ১২টা পর্যন্ত বৃদ্ধি করে বিধিনিষেধ জারি করেছিল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। আর এখন দেশে করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি উন্নতির দিকে। প্রতিদিনই কমছে সংক্রমণের হার। ফলে বিধিনিষেধ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এ ব্যাপারে গত রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আগামী ২১ ফেব্রুয়ারির পর থেকে নতুন করে কোনো বিধি-নিষেধ বর্ধিত করা হচ্ছে না। আর আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা) খুলে যাচ্ছে।

 

তিনি বলেন, বিধিনিষেধ উঠে গেলেও সর্বস্তরের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলকই থাকছে। যে কোনও সভা-সেমিনার কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ২৬ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে এক কোটি করোনা টিকা দেয়া হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়াই স্থায়ী ঠিকানা লিখে নিয়ে গিয়েই টিকা দেয়া যাবে। আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চিন্তা করছে ১২ বছরের নিচেও কীভাবে তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন দেয়া যায় তা নিয়ে কাজ করার।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হবে। এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও ক্লাস হবে আগের মতো স্বল্প পরিসরেই। আর যে শিক্ষার্থীরা করোনার দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে, তারাই কেবল শ্রেণিকক্ষে যাবে। বাকিদের দ্বিতীয় ডোজ না নেওয়া পর্যন্ত অনলাইন ও টেলিভিশনেই পাঠদান হবে।

আরও সংবাদ >>ভাষাশহীদদের প্রতি ঝিকরগাছা স্বেচ্ছাসেবক লীগের শ্রদ্ধা

ডা. দীপু মনি আরও জানিয়েছিলেন, বন্ধের আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেভাবে সংক্ষিপ্ত ক্লাস চলছিল সেভাবেই শুরু হবে।

 

এদিকে, রোববার রাতে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ স্বাক্ষরিত ২০ দফা নির্দেশনার একটি আদেশ জারি করেন। সেই নির্দেশনাগুলো হলো- যেসব শিক্ষার্থী করোনার টিকার দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছে, সশরীর শ্রেণি কার্যক্রমে শুধু তাদেরই অংশ নেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথসহ অন্যান্য জায়গায় করোনা মহামারি সম্পর্কে সরকারঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে করণীয় বিষয়গুলো ব্যানার বা অন্য কোনো উপায়ে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথে সব শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের শরীরের তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা; পরিস্থিতি বিবেচনায় অনলাইন বা ভার্চ্যুয়াল প্ল্যাটফর্মে পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম অব্যাহত রাখা, শিক্ষার্থীদের ক্লাসসূচি আগের নির্দেশনা মেনে প্রণয়ন করা, ভিড় এড়াতে প্রতিষ্ঠানের সব প্রবেশ ও প্রস্থানপথ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা এবং একটি প্রবেশ বা প্রস্থানের পথ থাকলে সে ক্ষেত্রে একাধিক প্রবেশ ও প্রস্থানের পথের ব্যবস্থা করা, প্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের আনন্দঘন পরিবেশে শ্রেণি কার্যক্রমে স্বাগত জানানোর ব্যবস্থা করা।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, প্রতিষ্ঠান খোলার প্রথম দিন শিক্ষার্থীরা কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রতিষ্ঠানে অবস্থান ও বাসা থেকে আসা-যাওয়া করবে, সে বিষয়ে তাদের অবহিত করা, প্রতিষ্ঠানের একটি কক্ষ প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাসহ আইসোলেশন কক্ষ হিসেবে প্রস্তুত রাখা, সব ভবনের কক্ষ, বারান্দা, সিঁড়ি, ছাদ ও আঙিনা যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, প্রতিষ্ঠানের সব ‘ওয়াশ রুম’ নিয়মিত সঠিকভাবে পরিষ্কার রাখা ও পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মচারী, অভিভাবকসহ অন্য কারও প্রবেশ, অবস্থান ও প্রস্থানের সময় স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে পালন করা, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারী এবং অন্যদের সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান করার বিষয়টি নিশ্চিত করা, প্রতিষ্ঠানে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধোয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বসার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং ৩ ফুট শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যবস্থা করা, খেলার মাঠ, ড্রেন ও বাগান যথাযথভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যা নিরূপণ করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে আনন্দঘন শিখন কার্যক্রমের মাধ্যমে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালিত করার ব্যবস্থা করা এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি ও অভিভাবকদের সঙ্গে সভা করে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।আর এসব বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নিতে মাউশির সব আঞ্চলিক পরিচালক ও উপপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, করোনার সংক্রমণের কারণে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছিল সরকার। করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে দীর্ঘ ১৮ মাস পর গত বছরের সেপ্টেম্বরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলেও শ্রেণি কার্যক্রম চলছিল স্বল্প পরিসরে। সব শ্রেণির ক্লাস সব দিন হচ্ছিল না। কিন্তু নতুন করে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ২১ জানুয়ারি আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। প্রথম দফায় এ ছুটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ৬ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু পরে তা আবার বাড়িয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়।
সময়েরআলো