আমাদের ক্যান্টনমেন্ট খয়েরতলা বাজার।

বিএম ইউসুফ আলীঃযশোর শহরের উপকন্ঠে একটি বাজার আছে যার নাম ক্যান্টনমেন্ট খয়েরতলা বাজার। যশোর ঝিনাইদহ সড়কে উপর এবং যশোর ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন ও খয়েরতলা কৃষি গবেষণা কেন্দ্র সংলগ্ন এই বাজারটি ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত।

যশোর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত এই বাজারে আশেপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকেরা ও সেনাবাহিনীতে কর্মরত চাকরিজীবীরা মূলত এখানে বাজার সাদাই করেন। সেখানে কয়েকশত পাকা ও কাঁচা-পাকা দোকান দোকান রয়েছে। ক্রেতারা সব ধরনেই কেনাকাটা করতে পারেন এই বাজার থেকে। যার কারণে সবসময় লোকসমাগম দেখা যায়।

এই এলাকার মধ্যে এটি একটি বেশ পুরনো বাজার। কেউ কেউ এই বাজারকে পুরাতন খয়েরতলা বাজার বলে থাকেন। কারণ বাজারটি খয়েরতলা গ্রামেরই একটি বাজার ছিল। এই খয়েরতলা গ্রামটি পাকিস্তান আমলে এই বাজার থেকে দক্ষিণে অডিন্যান্স ডিপো উত্তর পূর্ব পাশে যে ব্রিজ আছে সেখান থেকে গ্যারিসন সিনেমা হলের পূর্ব পর্যন্ত বিশাল এলাকায় ছিল। কিন্তু খয়েরতলাসহ ২১ গ্রাম বা মৌজা যশোর ক্যান্টনমেন্ট স্থাপিত হওয়ার সময় একোয়ার করে নেওয়া হয়। একবার ব্রিটিশ আমলে তাদের ওঠিয়ে দেওয়া হয়। ব্রিটিশরা ১৯৪৭ সালে চলে গেলে সেইসব গ্রামের মানুষজন তাদের পুরনো বাড়িতে ফিরে যায়। এরপর ১৯৫৮/৫৯ সালে পাকিস্তান আমলে যশোর ক্যান্টনমেন্ট স্থাপিত করার জন্য জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। এখানকার অনেকেই এখনকার মূর্তির মোড়ের আশেপাশে নতুনভাবে বসবাস শুরু করেন। যার কারণে এটি নতুন খয়েরতলা আর আগেরকার গ্রামের নাম হয়ে যায় পুরাতন খয়েরতলা।

পাকিস্তান আমলে খয়েরতলা গ্রামের পূর্বদিকে সর্বশেষ বাড়ি ছিল বর্তমান নতুন খয়েরতলার জাফর মোল্লার বাড়ি। অর্থাৎ ফসিয়ার ও মোস্তফা সাহেবের বাবার নাম জাফর মোল্লা। এই গ্রামের পশ্চিমে বাড়ি ছিল নুরপুর গ্রামের লুৎফর রহমানদের (ডাবু মাস্টার) বাড়ি। অর্থাৎ গ্যারিসনের পূর্ব দিকে পানির ট্যাংকি পর্যন্ত ছিল। ব্রিটিশ আমলে খয়েরতলা বাজারটি রেলস্টেশনের পশ্চিমদিকে ছিল। তখন সাপ্তাহিক বাজার বসতো। দূর দুরান্ত থেকে নৌকায় করে লোকেরা এই হাটে আসতো। নৌকা থেকে নামতো পাম্পের সামনের বটগাছের নীচেয়। সেই গাছটি এখন আর নেই। স্বাধীনতার আগে পাম্পের দক্ষিণ পাশে যে রাস্তাটি সেনানিবাসে প্রবেশ করেছে তার পাশে কিছু দোকান ছিল। জহর মোল্লার দোকান, বকশির মুদি দোকান, মহিদের দোকান, জয়নালের দোকান, করিমের সাইকেলের গ্যারেজ ছিল। সেখানেও একটি বটগাছ ছিল। এই বটগাছের খোড়লে দর্জি হুজুর (বাজার মসজিদের ইমাম, নাম সম্ভবত শামসুদ্দিন) এবং মকসেদ ভাই টেইলার্সের কাজ করতো। পাম্পের পিছনে ছিল ক্যান্টনমেন্ট প্রাইমারি স্কুল আর স্টেশনের পশ্চিম দিকে ছিল একটি মাদ্রাসা।

স্বাধীনতার পর এই বাজারটি সম্প্রসারিত হয়। এখন যেখানে বাজারটি গড়ে ওঠেছে এই দিক দিয়ে পাকা যশোর ঝিনাইদহ পাকা সড়ক ছিল। পারে এই বাকা পথটি সোজা করে তৈরি করা হয়। যা বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর পরিত্যক্ত রাস্তার পাশেই গড়ে ওঠেছে বর্তমান বাজারটি। বাজারের ইন্তাজ আলী টেইলার্স মাস্টারের বাবা ইয়াকুব বিশ্বাস প্রথম দোকান শুরু করেন। এরপর আস্তে আস্তে বাজারে দোকানের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। তখন বাজারের উত্তর পশ্চিম দিক দিয়ে প্রবেশপথের দুপাশে এবং নুরপুর দিক থেকে যে রাস্তাটি বাজারে মিশেছে এই মোড়ে বেশ কয়েকটি দোকান ছিল। সেখানে একটি বড় আমগাছ ও রাস্তা জুড়ে অনেক আমগাছ ছিল। মসজিদের সামনে শানতলার আকিমুদ্দি ভাইয়ের টেইলার্সের দোকান ছিল। বিহারি বাবুর বাবার একটি লন্ড্রির দোকানও ছিল। তিনি কয়লাচালিত ইস্ত্রি দিয়ে কাজ করতেন। আর আমাদের গ্রামের হাসেম মুন্সির এক ভাইয়ের তরি-তরকারির দোকান ছিল। তাছাড়া নুরপুর গ্রামের শমসের বিশ্বাস জেলেদের জোর করে বাজারে ধরে এনে মাছের বাজার প্রতিষ্ঠা করেন।

বাজারের মসজিদটি ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় । এই মসজিদের একসময়ের ইমাম ছিলেন দর্জি হুজুর। আর মুন্সি শামছুর রহমান মুয়াজ্জিন ছিলেন। ১৯৮৯ সালে প্রথম পাকা দোকান নির্মাণ করে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড। সেই থেকেই বাজারের আধুনিকায়ন শুরু হয়েছে। নাম হয় ক্যান্টনমেন্ট সুপার মার্কেট।
ভৈরব নদের বাঁকে টিলার মতো ছিল। যেখানে মাছ বাজার সেখানে ছিল টিলাটি আর এই টিলার উপর ছিল কবর স্থান। তার উল্টো দিকেই ছিল শ্মশান। ১৯৮২-৮৩ সালের দিকে রেলস্টেশন প্রতিষ্ঠার কারণে ক্যান্টনমেন্ট খয়েরতলা চেকপোস্ট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে বাজারের গুরুত্ব আগের চেয়ে কিছুটা কমে গেছে।