নাবিকজীবনের আত্মকথা

নাবিকজীবনের আত্মকথা নাবিকজীবন খুবই কষ্টকর
মো:মজিবুলহক: জোয়ার ভাটার সমুদ্রের লোনাজলে জাহাজ ভাসিয়ে জীবনবাজি রেখে উত্তাল তরঙ্গের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা মানুষগুলো আমরা নাবিক। কতজনেই সখের বশে ছুটে যায় সাগরপাড়ে সুর্যোদয় এবং সুর্যাস্ত দেখার জন্য এবংকি সভ্য সমাজের মানুষগুলো মৎস্য কন্যা জল কন্যা বা সমুদ্র কন্যার মিথ্যে কল্পকাহিনী বিশ্বাস করে কিন্তু অথৈ সমুদ্রের বাস্তবতা তারা দেখেনা তাই অবগত নহে, যদিও তারা সমুদ্র নিয়ে গল্প কবিতা গান লিখে আর জানেনা বলেই বিশাল সমুদ্রে জ্বোয়ার ভাটার সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা আমরা জল মানবগুলোর কথা তাদের কলমের ভাষায় থাকেনা। তোমরা সাগর সমুদ্র নিয়ে কল্পকাহিনী লিখো আর আমরাই সেই সমুদ্রের দুঃসাহসিক নাবিক আমরাই তার বাস্তবরূপ, আমরা নাবিকরা বাড়ি-ঘর মা-বাবা স্ত্রী-সন্তান আত্মীয়-পরিজন ত্যাগ করে আশ্রয় নিয়েছি সেই (ভাসমান কারাগারে) অথৈ সাগরেরই বুকে, ০৩নং বিপদ সংকেত শুনেও অনেকেই চিন্তা করো এবং সংকেত বাড়ার খবর পেলেই সাথে সাথে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজো আর ১০নম্বর বিপদ সংকেতেও আমাদের আশ্রয় খোঁজার জায়গা নেই। পড়ে থাকি নদী/সাগরের বুকে, তখন ব্যস্ত থাকতে হয় কোম্পানির সম্পদ রক্ষার্থে, তারপরেও আমরা জলমানবগুলো ভালোবাসার অভাবোনুভব করি প্রতিনিয়ত। আমরা জাহাজ নামক এই ভাসমান কারাগারের নাবিকগুলো সময়মতো পারিনা আপনজন তথা আত্মীয়-স্বজনদের সুখানন্দ বা বিপদাপদে উপস্থিত থাকতে, এবং সম্ভব হয়না কত মৃত আপনজনের চেহারাটিও শেষবারের মতো একটিবার দেখার।

ভাসমান কারাগারের কয়েদি
আমরা নাম আমাদের নাবিক
সাগরপথ পাড়ি ধরি আমরা
মোরা সবে একেকজন নির্ভীক
পরিবার-পরিজনেরই দুরত্ব
বাড়িয়েছি হতে যেয়ে নাবিক
শত ব্যথা হৃদয়ে গেঁথেই চলি
আমরা হয়েছি বলেই নাবিক
আত্মীয়-প্রিয়জনের বিপদে
হাজির হতে পারিনা আমরা
নাবিকজীবনের প্রয়োজনে
থাকি আমরা এদিক-ওদিক
কি এক জীবন বেচে নিলাম
আমরা নাম তাহার নাবিক
ইচ্ছে করলেই তখন যাওয়া
যায়না বাড়ি আমরা নাবিক
নাবিকজীবনের কষ্ট জানে স্রষ্টা
আর জানি আমরা সব নাবিক
তবুও গর্বে বুক ফুলাই আমরা
হতে পেরেছি বলেই নাবিক
রাষ্ট্র উন্নয়নে নৌ-শিল্পে উন্নতি
সাধক আমরাই সকল নাবিক
কেহই মানো বা নাইবা মানো
জানে আমাদের মহান মালিক
মহামারি করোনা পরিস্থিতিতেও
থেমে ছিলোনা দুঃসাহসিক নাবিক
থেমে গেলেই অর্থনীতির গতিশীল
চাকা হয়েই যেতো অগতিক

একটি নাবিকজীবন কতইনা সপ্ন বুনে থাকে তবে হারিয়েই যায় কতশত সপ্ন ঢেউয়ের ভাঁজে ভাঁজে, তবুও নাবিক নামের মালা গলে পড়ে আমাদের জীবন চলা এবং চলি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জুন জুলাই মাসের মতো (কথিত হাবিয়া জাহান্নাম) ক্ষেপা বঙ্গোপসাগরে, এবং আরো চলতে হয়েছে বৈশ্বিক মহামারি করোনা পরিস্থিতিতেও। এভাবেই আমাদের চলতে হবে কেননা আমরাতো দেশপ্রেমিক নাবিক, বাংলাদেশের সবচেয়ে সর্ব বৃহত্তম সেক্টর হলো নৌ-সেক্টর এই সেক্টরে আমরা দেশের ৮০% পন্যসামগ্রিই এক বন্দর থেকে অন্য বন্দরে পরিবাহিত করতেই হবে নাহয় একদিন যদি নৌ-সেক্টর বন্ধ থাকে সরকারের হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা ক্ষতি এবং দেশে দেখা দিবে খাদ্য ও তৈল সংকট। তাইতো পুরো করোনা পরিস্থিতিতে দেশ লকডাউন ঘোষণা থাকলেও আমরা নাবিকরা লকডাউনের আওতায় ছিলামনা, এসব ভাবলে গর্ববোধ হয় আমরা দেশ ও দশের স্বার্থে নিজেকে সপিত প্রাণ, কিন্তু কষ্টের ব্যাপার হলোঃ আমরা নাবিকদের নিয়ে কেহই ভাবেনা! আমরা যদি সবার তরে হই -আমাদের তরে কেনো মালিক/সরকারের কোন কর্তব্য থাকেনা! মহামারি পরিস্থিতি মোকাবেলায়ও আমরা অবহেলিত নাবিকরা স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ও মহামারি পরিস্থিতিতে এই দেশপ্রেমিক নাবিকদের প্রতি ছিলোনা মালিক/সরকার কর্তৃক কোন সান্ত্বনার বানীও আরেকটি কষ্টের বিষয় হলোঃ তৎকালীন সাংঘঠনিক নেতারাও নীরব ভূমিকা পালন করে গিয়েছিলেন! আমরা হয়ে গেলাম অভিভাবকহীন। এভাবেই চলছে নাবিকজীবন, -নাবিকজীবন কতটাই কষ্টকর একমাত্র ভুক্তভোগী নাবিকরাই জানেন, এই সংগ্রামী নাবিক/জীবনযোদ্ধাদের কষ্ট বুঝতে আল্লাহ যেনো নেতা ও মালিক এবং সরকারকে তৌফিক দান করে। চলছে জীবন এভাবে চলতে থাকবে সংগ্রামী নাবিকজীবন, এক বৈচিত্র্যময় জীবন এই নাবিকজীবন, নাবিকজীবনের গল্প লিখে শেষ করার মতো নয় !

আমাদের নাবিকজীবন খুবই বেদনাবহ
আমরা করি আপদ মোকাবেলা অহরহ
জুন জুলাই মাসের সাগরে উত্তাল পানি
সমুদ্র হবেই কথিত হাবিয়া নরক জানি
সবে থাকে তখন নিজ নিরাপত্তার কাজে
মোরা থাকি জাহাজ রক্ষা ব্যস্ততার মাঝে
জীবনবাজিতে সাগর পাড়ি মোদের কাজ
কতজনার মনে জাগে সখের নেশা আজ
হবেন নাবিক করবেন রোজগার ভরপুর
অনেকই জানেনা নাবিকের দুর্দশার খবর
প্রেয়সী বলে আমায় একটি কথা জিগাই?
প্রতিবেশী বলে নাবিকের অনেক কামাই!
সবাই মনেকরে নাবিকরা আছেন মহাসুখে
বোঝানো সম্ভব নয়রে দিন যায় কত দুঃখে
দুঃখকষ্টে দিন কাটে চাকুরী করি জাহাজে
নেই কাজ জানা কে নিবেই কামলা কাজে

এমনও জনশ্রুতি আছে; প্রবীণ নাবিকদের মুখে শোনা তারাও তাদের থেকে প্রবীণ নাবিকদের মূখে শুনেছেন এই সেক্টরের সূচনালগ্নে তৎকালীন গভর্নমেন্ট জলযানে মানুষ ভয়ে চাকুরী করতে চাইতেন না আর তাই সরকার তখনকার দিনে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদিদের মামলা খালাস করে তাদের জাহাজে কর্ম করাতেন এর থেকেও অনেকেই নাকি ভয়ে পালিয়েও চলে যেতেন কারন এটিও একটি জেলখানার মতোই, তাই অনেকেই বলে থাকেন জাহাজ হলো দ্বিতীয় জেলখানা আর আমি বলিঃ “ভাসমান কারাগার” অন্যান্য সেক্টরে একটি লোক যদি মারাও যায় তাহলে দাফন কাফনের ব্যবস্থা হয়, আর এই নৌ-সেক্টর এমনই একটি সেক্টর যেই সেক্টরে জাহাজ ডুবিতে যদি লোক মারা যায় বেশিরভাগই লাশও পাওয়া যায়না, আর যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের খালাস দিয়ে জাহাজে কর্ম করতে দেয়ার সেই সূত্র ধরে কিছুদিন পূর্বেও আমরা আমাদের প্রবীণ নাবিকদের কাছে ডেক ক্রু’দেরকে খালাসি সম্মোধন করতে শুনেছি যদিও সময়ের ব্যবধানে সেক্টরে শিক্ষিত লোকের পদচারণা এখন আর তেমন শোনা যায়না। তবুও এই পেশার তরে কোন ঘৃনা নয়! আছে আমাদের সম্মানবোধ কেননা আমরা সাধারণ নাবিকরা এই জীবন ঝুঁকির মধ্যদিয়েও জীবীকা নির্বাহ করে আমাদের পরিবার-পরিজন এর ভরনপোষণ চলে। ভালো থেকো মাতৃভূমি বাংলাদেশ আমরা নাবিকরাতো শুধুই পেশাজীবী নয়! তোমার দুঃসাহসিক সৈনিক ও গর্বিত সন্তান

লেখক: কবি ও কলামিস্ট