বেসরকারি শিক্ষকদের পেনশন এখন সময়ের দাবি

বেলায়েত হোসেন

জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন চলছে। জাতীয় বাজেট তৈরির আগে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সাথে প্রাক বাজেট আলোচনার একটা রেওয়াজ আছে দীর্ঘদিনের। কিন্তু দেশের শিক্ষকতা পেশায় জড়িতদের সাথে কখনো প্রাক বাজেট নিয়ে আলোচনা হয় কিনা তা আমরা খুব একটা খবর পাইনা। আবার এই শিক্ষক পেশার মধ্যে বহু শ্রেণি বিভাগ আছে তা হয়তো অনেক বড়কর্তারা ইচ্ছা করেই বুঝতে চান না।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যার সুফল দেশ ও জাতি পেতে শুরু করেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে ঝরে যাওয়ার সংখ্যা কমে গেছে। চলতি বাজেটে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা এবং সহজ শর্তে হাউজ লোনের ব্যবস্থা করে দেশের শিক্ষক কর্মচারীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা সুরক্ষা করবে এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

আজকে যে শিক্ষকদের কথা বলতে যাচিচ্ছ তা শুনে অনেকের গায়ে জ্বালা ধরতে পারে। কিন্তু দেশে সবচেয়ে বেশি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষিত করা দায়িত্ব পালন করেন এই শিক্ষকরা। এই ছাপোষা শ্রেণির শিক্ষক হলেন এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষকরা।

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক বলতে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও মাদ্রাসা পর্যায়ের শিক্ষকদের বুঝানো হয়। যারা শুধু বেতনের মূলস্কেলের সাথে ১০০০ টাকা বাড়ি ভাড়া, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পেয়ে থাকেন। বছরে দুই উৎসবে মূল বেতনের ২৫% বোনাস পেয়ে থাকেন। বৈশাখী ভাতা পেয়ে থাকেন। সরকারের কাছ থেকে তাদের পাওয়া এই টুকুই। এই এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষক শ্রেণি বর্তমান এই বহুমাত্রিক চাহিদার সময়ে এই বেতন দিয়ে কিভাবে সংসারের চাহিদা মিটিয়ে টিকে আছে তা নিয়ে রীতিমত গবেষণার দাবি রাখে।

শিক্ষকদের করুণ কাহিনী
বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে গুরু বা শিক্ষকদের সম্মান সর্বজনবিদিত। বর্তমানে এই আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায়ও অন্য পেশার চেয়ে শিক্ষকরাই বেশি সম্মানীয়। কিন্তু কেমন জানি শিক্ষকদের মধ্যে বেসরকারি শিক্ষকরা সম্মান পাওয়ার দিক দিয়ে একটু পিছিয়ে। সম্মান পাওয়া বা না পাওয়ার অনেক গুলো কারণের মধ্যে এখন প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক অবস্থান। বর্তমান সমাজের সকল শ্রেণি পেশার লোকজন জানে বেসরকারি স্কুল, কলেজ মাদ্রাসার শিক্ষক কর্মচারীদের কার বেতন কত? বেতন পাওয়ার তারিখ হয়েছে কি না? শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন পেয়েছে কি না? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে সেখানে সরকারি নিয়মনীতি বা নিয়ন্ত্রণ বলতে কিছু ছিল না। শিক্ষরা এবং প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগক্তারা নিজ উদ্যোগেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। তখন শিক্ষক কর্মচারীরা সরকার থেকে কোন আর্থিক সুবিধা পেতেন না। বেসরকারি শিক্ষকদের দুর্দশা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক কাহিনী প্রচলিত আছে। ১৯৮০ সাল থেকে সরকার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে নজর দেয়। এবং অল্প পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতা প্রদান শুরু করে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে বিশেষ নজর দেয়।

বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী পুরোপুরি সরকারি নিয়মনীতি মেনে চলতে বাধ্য এবং সরকারের পুরো নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। এখন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারেন না। শিক্ষক নিয়োগ হয় এনটিআরসির মাধ্যমে। এমপিওভ’ক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই রাষ্ট্র, সমাজ ও সংসার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। এত বঞ্চনা মেনে নিয়ে তিনি নিরবে শিক্ষা প্রদান করে থাকেন। যাদের সংসার চলে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীর বেতনে তারা বোঝেন এই জ্বালা। সংসার চালানো, ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করার পর আর ভবিষ্যৎ সঞ্চয় করার আর্থিক সক্ষমতা অধিকাংশ শিক্ষকদেরই থাকেনা। এতকিছুর পরও যখন তিনি অবসর গ্রহণ করেন তখন আরো কঠিন বাস্তবতা বুঝতে পারেন। একদিকে বেতন বন্ধ। অবসরকালীন টাকা ও কল্যাণ ভাতার টাকা উঠাতে ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। মোটামুটি শতকরা ১৫ থেকে ২০শতাংশ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অবসরকালীন ভাতার টাকা উঠানোর আগেই মারা যান। আর বাকিরা জীবনের বাকি সময়টা পরিবারের সদস্যদের উপর নির্ভরশীল হয়ে, সমাজের মুচকি হাসি দেখে দেখে অর্থনৈতিক কষ্টে কোন রকম সামাজিক মর্যাদা ছাড়াই দিনাতিপাত করেন। এ অবস্থায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীদের প্রাণের দাবি এ বছর থেকেই তাদের জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করা হোক এবং বাড়ি করার জন্য সরকারি চাকুরিজীবীদের মত সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদান করা হোক।
jagonews24