কুয়েটের চার শিক্ষার্থীর তৈরি ড্রোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্যাকসিন পৌছাতে সক্ষম

বর্তমান সারাবিশ্বের করোনা পরিস্থিতিতে জরুরিভিত্তিতে প্রত্যন্ত চরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকা এবং দেশের গ্রামাঞ্চলে কোনো প্রকার সংক্রমণের ঝুঁকি ছাড়াই দ্রুততম সময়ে কভিড ভ্যাকসিন পৌঁছে দিতে সক্ষম ড্রোন তৈরি করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছে বাংলাদেশের খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের একদল ছাত্র।

চলতি বছরের গত ১৫-১৮ এপ্রিল ভারতের আইআইটি (Indian Institutes of Technology) উদ্যোগে আয়োজিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় টেক ফেসটিভ্যাল। প্রতিবছরের মতো এবছরও এই প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিযোগিতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশ নেয় বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষার্থীরা। এই ফেস্টেরই অন্যতম সেগমেন্ট ছিল ‘ড্রোন’ সেগমেন্ট। এই সেগমেন্টের কুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের দলটি আন্তর্জাতিকভাবে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।

খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র নিলয় নাথ (টিম লিডার), জাহিদ হাসান, শাহিনুর হাসনাত রাহাত, আয়াজ আল আবরার যৌথভাবে এই ড্রোন তৈরি করেন। এই ড্রোন উদ্ভাবনের কাজ সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান করেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সহকারী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল এন নাহিয়ান। তার ছাত্ররা এমন একটা আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করায় তিনি বেশ খুশি।

ড্রোন প্রস্তুতকারী দলের দলপতি নিলয় নাথ জানান, এই প্রতিযোগিতা ২টি রাউন্ডে ভাগ করা হয়। প্রথম রাউন্ডে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন রিপোর্ট সাবমিট করতে হয়। এর ভিত্তিতে অসংখ্য দেশ-বিদেশের প্রতিযোগীদের থেকে বাছাই করে ২২টি দলকে দ্বিতীয় রাউন্ডের জন্য নির্বাচন করা হয়। দ্বিতীয় রাউন্ডে সম্পূর্ণ ডিজাইন এর খুঁটিনাটি বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করতে হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ডের দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে ফলাফল ঘোষণা করা হয় এবং আমাদের দল দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।

নিলয় নাথ গতকাল দুপুরে কালের কণ্ঠ চট্টগ্রাম অফিসে উপস্থিত হয়ে তাদের এই অর্জনের কথা জানান। এসময় তিনি বলেন প্রতিযোগিতাটি ছিল মূলত একটি ডিজাইন কন্টেস্ট যেখানে কিছু চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়। আমাদের একটি ড্রোন ডিজাইন করতে দেওয়া হয়, যা মূলত প্রত্যন্ত অঞ্চলে কভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন পৌছে দিতে পারবে।

শুধু ড্রোন তৈরি করলে হবে না। এই ড্রোনের নির্দিষ্ট পাঁচটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। তা হচ্ছে, ৫০ গ্রাম ভরের ২০০টি ভ্যাকসিনের বোতল বহন করতে হবে। কমপক্ষে ১০ কিলোমিটারর উড্ডয়নকাল থাকা লাগবে। কোনো প্রকার মানুষের সংস্পর্শ ছাড়া ভ্যাকসিন বহন করতে পারবে। ভ্যাকসিনের তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকা লাগবে। নিরাপদে ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভ্যাকসিনের বক্স লোড এবং আনলোড করতে পারবে।

নিলয় নাথ জানায়, যেহেতু ড্রোনকে কমসময়ে অনেক বেশি দূরত্ব ভ্রমণ করতে হবে তাই ড্রোনের ওজন হতে হবে অনেক কম এবং শক্তিশালী কাঠামোর। এই জন্য ড্রোন ডিজানের ক্ষেত্রে আমরা কার্বন ফাইবার ব্যবহার করি। যেটার ওজন অনেক কম এবং এর তৈরি কাঠামো অনেক শক্তিশালী। তারপর ভ্যাকসিনের তাপমাত্রা ২-৮ ডিগ্রি রাখতে আমাদের ভ্যাকসিন বাক্সের মধ্যে রেফ্রিজারেশন সিস্টেম রাখতে হয়। যাতে ড্রোনটি নিরাপদে ভ্যাকসিন তুলতে এবং নামাতে পারে সেজন্য আমরা দুই ধরনের গ্রিপিং সিস্টেম রাখি যেটা ভারবহনকারী ড্রোন এর জন্য সম্পূর্ণ নতুন ধারণা।

আমাদের জন্য এটি ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিযোগিতার ঠিক ১৫ দিন আগে আমরা কাজ শুরু করি। করোনা পরিস্থিতি ও সকলে একই শহরে না থাকায় অনলাইনে আমাদের কাজ শুরু করতে হয়। হাতে সময় কম থাকার কারণে দিনের বেলায় কাজের পাশাপাশি রাতেও আমরা টানা কাজ করেছি। ১৫ দিন টানা রিসার্চ এবং ক্যালকুলেশনের ওপর ভিত্তি করে আমরা আমাদের মডেল দাঁড় করাই। আমাদের চারজনের সর্বোচ্চ চেষ্টার ফলে আমাদের তৈরিকৃত মডেলের প্রদত্ত সকল বৈশিষ্ট্য অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা আমাদের সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে।

তাদের এই অর্জন দেশের এই কভিড পরিস্থিতিতে ভ্যাকসিন দ্রুত এবং দূরদূরান্তে নিরাপদে বহন করতে একটি নতুন ভাবনার দুয়ার উম্মচোন করবে বলে আশা প্রকাশ করেন নিলয় নাথ।