যশোরের মেয়ে শিশু আমেনাকে নির্যাতনের গল্প শুনলে আপনিও আতকে উঠবেন,সুষ্ঠু বিচারের দাবি।

মোঃ আসাদুজ্জামান শাওন,টাইম ভিশন ডেস্কঃ ছোট্ট শিশু আমেনা। বয়স-১১ বছর। যশোর সদর উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করে। ২ বছর বয়সে আমেনা, পিতা নূর ইসলামকে হারায়। হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে নূর ইসলাম মারা যায়।

আমেনার মা আকলিমা খাতুনকে, নানী জোহরা খাতুন পরে অন্য ঘরে বিবাহ দেয়৷ তখন থেকে ১১ বছর বয়সী আমেনার একমাত্র সহায়-সম্বল, পিতা-মাতার আদর-যত্ন, দায়িত্ব কাঁধে এসে পড়ে নানী জোহরা খাতুনের। জোহরা খাতুনের ১ ছেলে ও ১ মেয়ে। জোহরা খাতুনের দিনমজুর ছেলে আহাদুল ইসলাম ওরফে বিপুল। জোহরা খাতুনের সংসার চলে মানুষের কাছে হাত পেতে। একটা সময় হতদরিদ্র জোহরা খাতুনের পরিবার চালানো খুব কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছিলো। তাই জোহরা খাতুনের ভিক্ষার যৎসামান্য দিয়ে ওদের পরিবারের চলতো।

একদিন রাজাপুর গ্রামের পাশ্ববর্তী-বাগডাঙা দক্ষিণ পাড়া নামক গ্রামের প্রভাস নামে এক পিতার মেয়ে ঢাকায় বসবাসরত শ্যামলী তার শিশুকন্যাকে দেখভালের জন্য ১০-১২ দিন ধরে জোহরা খাতুনকে বুঝিয়ে আমেনাকে তার স্বামীর সংসার, ঢাকার মহাখালীতে নিয়ে যায়।

উল্লেখ্য, শ্যামলী নামের ওই মহিলার একই স্কুলের বান্ধবী ছিলো আমেনার মা আকলিমা খাতুন। আকলিমা খাতুন অন্য স্বামী সংসারে থাকায় তার মেয়ের সুব্যবস্থার কথা ভেবে বান্ধবী শ্যামলীর প্রস্তাবে রাজি হয় এবং গতবছর ২৩ মার্চ ২০২০-ইং এ শ্যামলী আমেনাকে ঢাকায় নিয়ে যায়। শিশুকন্যাকে দেখভালের কথা বলে নিয়ে গেলো আমেনাকে। আমেনার উপর নেমে আসে অমানিশার ঘোর অন্ধকার। দায়িত্ব পড়লো সংসারের সমস্ত কাজ করার। আমেনা গৃহপরিচারিকা।

বাচ্চা মেয়ে আমেনা। তাকে দিয়ে বাসা বাড়ীর সকল ধরনের কাজ করানো হয়। এর আগে আমেনা কোথাও শেখেনি এ ধরনের কাজ। শুরু হলো রুটি বানানো দিয়ে। রুটির পরিমান কম হওয়ায় আমেনাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নানাবিধ কায়দায় মারা হলো। হাত থেকে পিরিচ পড়া নিয়েও অমানুষিক নির্যাতন করা হলো। এভাবে চলতে থাকে প্রায় ৮ মাস নির্যাতন। এরপর একদিন আবারো রুটি বানাতে বলায় আমাকে বলা হলো তুই আটা খেয়ে ফেলেছিস। না হলে রুটি কম হলো কি করে? এসব কথা বলে, শ্যামলী এবং শ্যামলীর স্বামী বাদল আমেনাকে খুব নির্যাতন করতো। গরম খুন্তির ছ্যাকা, হাত ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে হাত মস্কে দিয়েছে, প্লাস দিয়ে মাথার চুল টেনে টেনে উঠিয়ে দিয়েছে, গলায় এবং মাথায় আঘাত করেছে প্লাস দিয়ে। হাতে-পায়ে এবং শরীরে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিভিন্ন যায়গায় আঘাত করা হয়েছে। এমনকি শ্যামলীর স্বামী শিশু আমেনার পায়ের উপরে দাঁড়িয়ে যন্ত্রণা দিয়েছে এবং শ্যামলী আমেনার বুকের উপর দাঁড়িয়ে লাফালাফি করেছে। আমেনার মুখে টেপ লাগিয়ে আমেনাকে যখন হত্যা করার চেষ্টা করা হয়, হঠাৎ তখনই বাইরে থেকে কেউ একজন এসে ওদের দরজায় নক করে। শ্যামলীর কন্যাশিশু কেঁদে ওঠে। এই বুঝি আমেনার জীবন বেঁচে গেলো। আমেনার নানী অনেকবার ওদেরকে অনুরোধ করেছে আমেনাকে একবারের জন্য হলেও বাড়ী পাঠাতে। নানাবিধ ছলনা করে আমেনাকে বাড়ী পাঠায়নি। শেষমেশ আমেনার নানী আমেনাকে উদ্ধার করতে টাকাপয়সা ঋণ করে রওনা হলো ঢাকায়।

বাদলের কাকা গাবতলি থেকে রিসিভ করে জোহরা খাতুনকে নিয়ে গেলো মিরপুরের বাসায়। শ্যামলী মিথ্যা বলে, ওরা নাকি আমেনাকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি বরিশালে বেড়াতে গেছে। ওই কথা শুনে জোহরা খাতুন গ্রামের বাড়ী চলে আসে। জোহরা খাতুন পুনরায় ওদেরকে ফোন করে কান্নাকাটি করে আমেনাকে বাড়ি পাঠাতে বলে। কিন্তু ওরা আমেনাকে পাঠাবে কী করে!

আমেনার শারীরিক অবস্থা তো বেশ খারাপ। অবশেষে বাদল এবং শ্যামলী আর সহ্য করতে না পেরে বিপুলকে ফোন করে জোহরা খাতুনকে ঢাকায় যেতে বলে। জোহরা খাতুন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। গাবতলি থেকে বাদল জোহরাকে রিসিভ করে ওই কাকার বাড়ী নিয়ে যায়। ওই কাকার বাড়িতেই আমেনা ছিলো। তাৎক্ষণিক জোহরা খাতুন আমেনাকে নিয়ে বাড়ী চলে আসে। পরেরদিন জোহরা খাতুন আমেনার শারীরিক অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং গ্রাম্য এক ডাক্তারের সাজেশন অনুযায়ী আমেনাকে নিয়ে যশোরের বঙ্গবাজার আসে ঔষধ কিনতে। দেখা হয় স্বজন সংঘ’র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় কুমার নন্দীর সাথে। সঞ্জয় নন্দীর পরামর্শ অনুযায়ী জোহরা খাতুন আমেনাকে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করায়। বর্তমানে আমেনা যশোর সদর হাসপাতালের, (৩য় তলা), ৯ নং মহিলা ওয়ার্ডের ৯-নং বেডে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কে জানতো এই বয়সে তার জীবনে এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে?
আমেনা এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাঁদছে। এই সুশীল সমাজের মানুষের দিকে ওর চোখ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। অনুভূতিহীন চোখ যেন কিছু বলতে চায়……….

কী হবে আমার!
আমি কি পাবো সুবিচার?
কে লড়বে আমার পক্ষ নিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে!
দেশে কি এভাবেই আমাদের মতো শিশুদের নির্যাতন হতেই থাকবে!

(শিশু আমেনা খাতুন এবং ওর নানী জোহরা খাতুনের দেওয়া তথ্যমতে স্বজন সংঘের প্রতিষ্ঠাতা সাধন কুমার দাসের হাতে লেখা পুরো ঘটনা হুবহু তুলে ধরা হলো।)
ওদের পুরো নাম এবং ঢাকার ঠিকানা আমেনা এবং ওর নানী জোহরা খাতুন ভালো বলতে পারেনি।