বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স:কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় চরম ভোগান্তির শিকার

জি এম অভি,যশোর: কর্তৃপক্ষের চরম উদাসিনতা এ অব্যবস্থাপনার কারনে যশোরের বাঘারপাড়ার লাখো মাুষের স্বাস্থ্য সেবার একমাত্র ঠিকানা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির আজ বেহালদশা। এখানে স্বাস্থ্য সেবা নিতে আসা রোগী সাধারণকে প্রতি পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। সরকারী ওষুধের পরিবর্তে রোগীদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রেসক্রিপশন। যতসামান্য যে সরকারী ওষুধের ব্যবস্থা আছে তাও হচ্ছে কালোবাজারী। সরকারী হাসপাতালের ওষুধ মিলছে বেসরকারী কিনিক বা ফার্মেসীতে। এর পাশাপাশি এখানে ভর্তি রোগীদের ভোগান্তিরও শেষ নেই। ফলে লাখো মানুষের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর তা আজ নানা সমস্যা, সংকট, অনিয়ম ও দুর্নীতির বেড়াজালে নিমজ্জিত। ফলে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ উপজেলাবাসী। কতৃপক্ষের চরম উদাসীনতায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন নিজেই আইসোলেশনে ।
এসব সমস্যা ও সংকটের মুলে রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: শরিফুল ইসলামের নানা দুর্নীতি। তার বিরুদ্ধে রোগীদের ওষুধ সরবরাহ না করে ওষুধের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, নিয়মিত অফিসে না এসে ভারপ্রাপ্ত আরএমও দিয়ে হাসপাতাল তদারকি করা, ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছ থেকে কমিশন বাণিজ্যসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে এ উপজেলা মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।
জানা যায়, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী গুরুত্বপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানে মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগে কোন জুনিয়র কনসালটেন্ট ও এ্যানেস্থেসিয়ার চিকিৎসক নেই।
এর সঙ্গে ওয়ার্ডবয় তিনটি ও দুটি আয়ার পদ শূন্য রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সরজমিনে অনুসন্ধানে গেলে মেডিসিন ওয়ার্ডের ৪২ নং বেডে থাকা দেয়াড়া রায়পুরের রোগি জানান, দুই দিন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে হয়েছে আর আয়া সুইপারের খারাপ আচরন সইতে হচ্ছে। শেখের বাতানের জাহাঙ্গীরের স্ত্রী রেশমা খাতুন সরকারী কোন ওযুধ পায়নি বলে জানান। মেঘনা নামের রোগির বেডে দেখা যায় ইনজেকশন ইসোটিড ৪০, টোরাক্স ৩০, প্রোনেক্স ৪০, এমনকি ৫ সিসি সিরিঞ্জসহ বিভিন্ন ওষুধ ক্রয় করেছেন স্বামী মোতালেব মোল্লা। মালঞ্চীর মোতালেব মোল্লা দৈনিক যশোরকে জানান, রোগী ভর্তীর পরে সকল ওষুধ কিনতে হয়েছে। এই হাসপাতাল থেকে কোন সরকারী ওষুধ তারা পায় না।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় সন্তান প্রসবের জন্য ভর্তি হয় দোহাকুলার হানিফের স্ত্রী জান্নাতি বেগম। তার কাছে দেখা মেলে সার্জিক্যাল সামগ্রী মডেস্ট প্যাড, ৫ সিসি সিরিঞ্জ, ক্যাটগ্যাট -১ হ্যান্ড গøাভস ও ক্যানোফিক্সসহ বিভিন্ন ওষুধ। রোগির মা আনজুরা বেগম দৈনিক যশোরকে জানান, হাসপাতাল থেকে দুইটা বড়ি বাদে সবই কিনতে হয়েছে। এদিকে লেবার ওয়ার্ডের রোগি ইতি কিনেছেন ১৫শ টাকার ওষুধ, ডায়রিয়া রোগি বদিরুন্নেছার ছেলে হেমায়েত জানায়, তারা প্রায় ২৬শ টাকার ওষুধ ক্রয় করেছেন। পেটে ব্যাথার রোগি মাসরুর আলমসহ সকলেই প্রায় ওষুধ কিনে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদেও অভিযোগ হাসপাতালে সরকারী ওষুধ থাকলেও তা তাদেও দেওয়া হয় না। এন্টাসিড আর প্যারাসিটামল ছাড়া তারা এই হাসপাতালের কোন ওষুধ পাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সব ওষুধ বাইওে থেকে কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।
রোগীর স্বজনরা বলেন,সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে যদি এতো ওষুধ কিনতে হয় তাহলে আমরা গরীব মানুষ কোথায় যাব?
শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়েছেন নলডাংগা গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক আহমেদ। তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললেন তার ােভের কথা । তিনি বলেন অনেক কষ্টে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি । এ ওয়ার্ডে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরতি রয়েছে একটি বেড । সেখানে নেই কোন ফ্যান । শয্যাটির পায়া ভাংয়া। ওষুধতো কিনতেই হচ্ছে এবং কর্তব্যরতদের ব্যবহার খুবই খারাপ। এবিষয় জানতে চাইলে হাসপাতালের ওয়ার্ড ইনচার্জ মারিয়া সুলতানা দৈনিক যশোরকে জানান, কিছুদিন হলো ফ্যানটি নষ্ট হয়েছে । ওটা শীঘ্রই মেরামত করা হবে । আর ওষুধ সাপ্লাই রয়েছে ইনজেকশন সেফট্রিয়াক্সন ১ গ্রাম,২ ও ৫০০ গ্রাম,সেফুরক্সিম ৭৫০,ওমিপ্রাজল ৪০ ও বাচ্চাদের সেফটাজিডিম ২৫০। জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: শরিফুল ইসলাম এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমাদের হসপিটালে ঔকুধের কোনো ঘাটতি নেই। সবকিছুই সাপ্লাই রয়েছে এবং রোগীরাও পাচ্ছেন।
হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে রয়েছে নানান অনিয়ম । নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন রোগীর স্বজনেরা জানান, যেসব টেস্ট হাসপাতালে হয় সেগুলোও বেশীরভাগ রোগীদের বাহিরে পাঠিয়ে কমিশন ভোগ করেন ওই বিভাগের কর্তারা। প্যাথলজি বিভাগের মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) মো: শাহনেয়াজ বলেন, ভাই আমি এখানে ১৩ বছর যাবৎ রয়েছি। আমি কোনো অনিয়ম করিনা। অনেকদিন এখানে থাকার ফলে এই বিভাগটি আমার আতœীয়ের মতো হয়ে গেছে।
ডাক্তার শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তিনি সরকারি নির্দেশনা পালনে নীতিমালার তোয়াক্কা করছেন না। সূত্র জানায়,সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২৩ থেকে ২৯ এপ্রিল পুষ্টি সপ্তাহ পালনের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ১ লাখ ২৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। নীতিমালা অনুযায়ী কর্মসূচি পালন না করলেও ভুয়া বিল ভাউচারে প্রায় সমুদয় টাকা হজম করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শরিফুল ইসলাম । তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ শরিফুল ইসলাম।
সোনালী ব্যাংক বাঘারপাড়া শাখা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার ৬৩০ টাকা হাসপাতাল কর্তৃপ উত্তোলন করে । এদিকে দেখা গেছে পুষ্টি সপ্তাহ ইফতারি আপ্যায়ন, ডেকোরেশন পুষ্টিকর খাদ্য বিতরণ স্বাস্থ্যসুরা সামগ্রী ক্রয় ও বিতরণ বিজ্ঞাপন সহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর তালিকা অনুযায়ী গত ২৮ এপ্রিল ১২০ জন ব্যক্তিকে খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী মসজিদে জুম্মার বয়ানে ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিয়ে আলোচনা ও অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় পুষ্টিবিষয়ক প্রচারণা বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও আলোচনা শিশু-কিশোর গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি বিষয়ক বিশেষ পরামর্শ মুক্তিযুদ্ধ এবং বয়স্ক ব্যক্তিদের চেকআপ বøাড প্রেসার বøাড গøুকোজ এর মাত্রা নির্নয় করা প্রতিটি কমিউনিটি কিনিক ও শিশু-কিশোর গর্ভবতী নারীদের পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ সেব প্রদানসহ এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিং এবং দুস্থঃদের মাঝে পুষ্টিকর খাবার বিতরণ পুষ্টি বিষয়ক পরামর্শ প্রদানের কথা। কিন্তু নামমাত্র খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করে প্রতি সপ্তাহ পালন করা হয়েছে। বিভিন্ন খাতে খরচ দেখিয়ে ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে সরকারি বরাদ্দের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে । পুষ্টি সপ্তাহ পালন উপলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কে সভাপতি করা হলেও তাকে কিছুই জানানো হয়নি বলে জানা যায়।
স্থানীয়রা জানান, “কাজীর গরু কিতাবে আছে গোয়ালে নাই ” অবস্থা এ হাসপাতালে। বাঘারপাড়াবাসী সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের রেফার করেন যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে। আভিযোগ রয়েছে ডা: শরিফুল ইসলাম নিয়মিত হাসপাতালে অফিস করেন না। আর যেদিন তিনি হাসপাতালে বসেন সেদিন বহিরাগত লোকজন নিয়ে তার কে জমিয়ে আড্ডা দেন।
তবে স্থানীয়দের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ডাক্তার শরিফুল ইসলাম নিজের পক্ষেই সাফাই গাইতে থাকেন। তিনি বলেন, তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে স্থানীয় একটি চক্র তাকে তাড়াতে উঠে পড়ে লেগেছে। এর পেছনে স্থানীয় কিনিক ব্যবসায়ী ও মিডিয়ার কতিপয় কর্মীর ইন্ধন রয়েছে বলে তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন। তিনি বলেণ, এই হাসপাতালে কোন অনিয়ম নেই। এখানে রোগীরা সর্বোচ্চ সেবা পেয়ে থাকেন। নির্ধারিত বেডের তুলনায় কয়েকগুন বেশি রোগী থাকায় সবাইকে সরকারী ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা: শেখ আবু শাহীন দৈনিক যশোরকে জানিয়েছেন, এমন কোন অভিযোগের বিষয়ে আমার কাছে কোন খবর নেই। স্থানীয়রা এসব অভিযোগ সম্পর্কে আমাকে কিছুই জানাননি। তাছাড়া হাসপাতালে প্রায় প্রয়োজনীয় সব ওষুধই সরবরাহ আছে। তারপরও কোন অনিয়ম বা অভিযোগ থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।