আমাদের ঈদের একাল সেকাল;

বি এম ইউসুফ আলীঃ

আজ ঈদ। ঈদ অর্থ খুশি বা আনন্দ। কিন্তু সেই চিরচেনা খুশির ঈদের রূপ যেন পাল্টে গেছে। একধরনের শঙ্কার মধ্যে দিয়ে বাঙালি মুসলমানেরা তাদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর পালন করছে। । গত বছরের মত এবারও করোনার কারণে কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ঈদ উদযাপিত হচ্ছে। ঈদের আনন্দটাই যেন আজ ঘরবন্দী। সেই সাথে চলছে লক ডাউন। গত দু’বছর নির্বিঘ্নে ঈদ করা যায় নি। মানুষের মনে তেমন ফুর্তি নেই। যতটুকু হচ্ছে তা নিজ পরিবারে সীমাবদ্ধ । নিজেদের ভালোলাগাটুকু অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করছেন বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে। প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও গতবারের মতো এবাবও এক প্রকার বাধ্য হয়েই ঢাকা শহরে ঈদ করছি। গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে পারলে অন্য রকম ভালো লাগতো। কারণ গ্রামই যে শেকড়। সেখানে আছে নির্মল বায়ু। নেই মানুষের গাদাগাদি। জীবনের স্বর্ণালি সুন্দর দিনগুলো ওখানেই কাটিয়েছি। তবে আমাদের গ্রাম একেবারে অজপাড়া গাঁ নয়। শহরতলীর পরিচ্ছন্ন একটি গ্রাম। রাজধানীতে থাকলেও মন পড়ে আছে সেখানেই।

ছোটবেলায় ঈদ কবে হবে তা দিনক্ষণ গণনা করতাম। দিন যতই ঘনিয়ে আসত ততই মনের ভেতরে আলাদা একটি অনুভূতি সৃষ্টি হত। যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। রোজা ২৯টি শেষ হলেই রাস্তায় বা খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে দলবেঁধে চাঁদ দেখতাম। কে, কার আগে চাঁদ দেখতে পারে তার প্রতিযোগিতা চলত। চাঁদ দেখতে পেলে খুশিতে প্রাণ ভরে যেত। ঈদের দিন সকালে মা কিংবা বড় ভাবিরা সুগন্ধি সাবান দিয়ে ভালো করে গোসল করিয়ে দিতেন। তবে তা কৈশোরে। এরপর সেমাই খেয়ে নতুন কাপড় পরে ঈদগাঁয়ে নামাজ পড়তে যেতাম। অবশ্য সব ঈদে নতুন পোশাক ভাগ্যে জুটতো না। ঈদে নতুন কাপড় না পেলে অনেক কান্নাকাটি করতাম। এটা ওটা ছোড়াছুড়ি করতাম। এখন বুঝি কেন তা সম্ভব হত না। ভাইবোন ছিল অনেক। তাড়াছা আমাদের পরিবারটি ছিল কৃষি ভিত্তিক পরিবার । খরচ বেশি হত, হাতে তেমন নগদ টাকা থাকত না । এখনো বোধ হয় কৃষিজীবীদের অবস্থা এ রকমই। কখনো কখনো জমিতে ফসল ফলানোর খরচই ওঠে না।

ঈদ সেলামি প্রচলন ছিল। তবে তা সর্বোচ্চ পরিমাণ ১০ টাকা। কেউ ৫ টাকা, কেউবা ২ টাকাও দিত। আব্বা, বড়ভাই, মেজভাই ও সেজভাই এই বকশিশ দিতেন। পরবর্তীতে দুলাভাই ও বোনদের কাছ থেকেও সেলামি পেতাম। আজ থেকে কয়েক যুগ আগে টাকার মূল্যমান এখনকার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ছিল। এখন আর কপালে সেলামি জোটে না। বরং দিতে হয়।

আমাদের গ্রামের ঈদের জামাত উত্তর মাঠের বটতলায় অনুষ্ঠিত হয়। সেই পুরোনো বটগাছটি এখন আর নেই। কোনো এক ঝড়ে উপড়ে পড়েছিল। সেখানে আর একটি নতুন বটগাছ জন্মেছে। আমাদের নূরপুর ও ডাকাতিয়া গ্রামের ঈদের জামাত এই এক ঈদগাঁতেই হয়। এখন অবশ্য আরো কয়েকটি স্থানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। নূরপুর প্রাইমারি স্কুলের মাঠের পশ্চিম পাশে নদীর পাড়ে নতুন ঈদগাঁ হয়েছে। পূর্বে এই স্কুলের মাঠেই জামাত অনুষ্ঠিত হত। ঈদগাহের আশেপাশে দোকান বসত। সেইসব দোকানে জিলাপি, দানাদার, বাদাম, চানাচুর, মুড়লি (গজা), হাওয়াই মিঠা, আইসক্রিম, ভূতের ডিম (মুনমুনি), কাঠি লজেন্স, চকলেট, বাঁশি, খেলনা পিস্তল, মার্বেল, বেলুন ইত্যাদি বিক্রি হত। খেয়াল করতাম বিক্রেতারা তাদের জিনিসপত্র বিক্রি করতে বেশি ব্যস্ত থাকতেন। জামাতে নামাজ আদায়ে আগ্রহ কম ছিল। আমরা ছোটরাও ফেরার পথে বড়দের জন্য বাদাম বা জিলাপি কিনে নিয়ে আসতাম। বড়রা এতে খুব খুশি হতেন। খেলনা হিসেবে মার্বেল আর বাঁশি কিনতাম। বাড়িতে এসে তড়িঘড়ি করে খাবার খেতাম। তারপর খেলতে বের হয়ে যেতাম । মার্বেল খেলাই ছিল তখন একমাত্র নেশা। এই নেশা এমন ছিল দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও বাড়ি ফেরার কথা ভুলে যেতাম। এর জন্য বকুনিও খেতাম। বড় হয়ে দেখেছি ঈদের দিন বিকেলে বিবাহিত বনাম অবিবাহিত হাডুডু কিংবা ফুটবল খেলার আয়োজন হত। এখন এ ধরনের আয়োজন হয় কিনা জানি না। এছাড়া সারাদিন বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিতাম। আর এ বাড়ি, ও বাড়ি খাওয়া- দাওয়াও চলত। ঈদুল আজহার সময় কখনো কখনো কোরবানির গোসত বাড়িতে আনার দায়িত্ব পড়ত। ঈদকে সামনে রেখে শহরের সিনেমা হলগুলোতে নতুন নতুন সিনেমা প্রদর্শিত হত। কেউ কেউ তা দেখতে শহরের হলে ভীড় জমাত। এখন আর সেই অবস্থা নেই। অনেক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে। সেখানে গড়ে ওঠেছে শপিংমল বা বহুতলা বিশিষ্ট আবাসিক হোটেল- রেস্তোরাঁ ।

ঈদ উপলক্ষে এখন কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। আগেই বলেছি আমরা সব ঈদে পোশাক পেতাম না। আর আমাদের বাচ্চারা আজ বড় বড় বুটিক শোপ আর মেগা শপিং মলে ঢুঁ দেয়। নিজেদের পছন্দ মত কেনাকাটা করে। আগে থেকেই খোঁজ রাখে ঈদে নতুন কী পোশাক বাজারে আসছে। জুতা কিংবা সাজুগুজুর এটাসেটা কোনটিই বাদ পড়ে না। পার্লারে না গেলে যেন পেটের ভাত হজম হতে চাই না। করোনার জন্য এক্ষেত্রে অনেকেই তাদের এই শখগুলোতে কাটছাট করেছে। তেমন প্রয়োজন না হলে অনেকেই মার্কেটে যান নি। তারপরও গতবারের তুলানায় শপিং সেন্টারগুলোতে অনেক ভীড় ছিল। অনেকেই স্বাস্থ্য বিধি মানেন নি। কেউ কেউ আবার অনলাইন কেনাকাটা করেছেন। আর খাবার দাবার? ওটাতো আছেই। সেমাই, পায়েস, কাবাব, পোলাও, মাংস, রোস্ট, ফালুদা, কাস্টার্ড, চটপটিসহ নানা পদের আয়োজন। আহারে! কী রেখে কী খাই।

টিভির আয়োজনও বাহারি। আগে শুধু ছিল বিটিভি। ঈদে আগে সিনেমা বা ছায়াছন্দ কিংবা আরো দু’একটি অনুষ্ঠান হত। এখন কোন চ্যানেল রেখে কোনটি দেখবো তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়তে হয়। মিডিয়ার কারণে ঈদ আনন্দ আরো আনন্দময় হয়ে ওঠে । হবেনা কেন, ঈদ মানেই তো খুশি আর আনন্দ।