অভ্যাসের দাস : চৈতালী মুখার্জী কণা

অভ্যাসের দাস
চৈতালী মুখার্জী (কণা )
কত সহজে একটা কথা আমাদের মুখে রপ্ত হয়ে গেলো | “Covid-19” | এভাবেই বোধহয় প্রমাণিত হয় মানুষ অভ্যাসের দাস | পরিস্থিতির হাতে মানুষ শুধুমাত্র পুতুলনাচের পুতুল | যেদিন প্রথম নিউজ চ্যানেলের কল্যাণে কানে এলো কথাটা ভেবেছিলাম কি এমন আর ? প্রতিবেশী রাষ্ট্র চীনে তখন এই নিয়ে মোটামুটি ধূণ্ধুমার | আমরা গা এলিয়ে ঘোরা ,বেড়ানো ,পার্টি ,ফুর্তি বিয়ে বাড়িতে পাঁচশো ,হাজার নিয়ে ভাবছিলাম ‘আমার তাতে কি’ ? এমন একটা ভাব নিয়ে |
যেভাবে প্রতিবেশীর ঘরে চোর পড়লে আমরা উঁকি দিয়ে দেখে চোখ বন্ধ করি সেইরকম ভাব আর কি ? আমাদের নেতা মন্ত্রীরা ততক্ষণ বিদেশ পরিভ্রমন আর এ ওর পশ্চাৎদেশে কাঠি করতে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে ভাবতেই পারেননি চোরের তার বাড়িতে সিঁধ কাটতে বেশী সময় লাগবেনা |অথবা নিজের পাকা বাড়ির উপর অগাধ আস্থা ছিলো তাদের |
সে যাই হোক করোনা দিব্যি চীন আর আমেরিকার ঢিল পাটকেলের ফাঁক গলে চুপি চুপি সিঁধ কেটে ঢুকে পড়লো অনান্য দেশের সাথে আমার দেশেও |
প্রথম প্রথম থালা ,বাটি ,ঘটি যে যা পারলো বাজিয়ে ,শঙ্খ ঘণ্টা ধ্বনি করে ,মোমবাতির আলো জ্বেলে একতার নিদর্শন দেখানো গেলেও তারপর মনোবল এমন বাড়ানো গেলো যে জনসাধারণ ডাক্তার ,বৈজ্ঞানিক ,সমাজবিদ ,প্রধানমন্ত্রী কারো কথাকেই তোয়াক্কা না করে সদর্পে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন দোকান ,বাজার ,রেস্তোরাঁতে | পার্টিতে ,মলে |মানুষ অভ্যাসের দাস | সেই যুক্তিতেই চলতে থাকলো ফুর্তির ফোয়ারা | প্রশাসনের সাথে লুকোচুরি খেলা |
পরিণাম স্বরূপ লক ডাউন | সাথে ,সাথে গর্জে উঠলো মানবদরদী নেতা ,সাংবাদিকদের কলম | ওইযে আবার সেই কথা ,মানুষ অভ্যাসের দাস | সমালোচনা তার জনমসিদ্ধ অধিকার | শ্রমিকদের দুঃখে কেঁদে উঠলো জনদরদী মন | আর তাই কাজ বন্ধ হওয়া শ্রমিকদের খাদ্য সরবরাহ না করে তাদের গাড়ী বোঝাই করে ফেরত নিয়ে আসা হলো স্বস্থানে | অর্থাৎ যেখানে অন্ন বস্ত্র সংস্থান না হওযার জন্য তাদের বাইরে যেতে হয়েছিলো সেইখানেই আবার তাদের নিয়ে আসা হলো ফেরত স্বপরিবরে হয়তো অনাহারে কিংবা করোনাা আক্রান্ত হয়ে স্বর্গবাসী হওয়ার জন্য |
অবশ্য সঠিক জানা নেই সেই স্বর্গ বাসের “পাশ” টা জনদরদী আমলাদের হাতে ছিলো কিনা ?? থাকতেও বা পারে | মানুষ অভ্যাসের দাস | অন্ধবিশ্বাসও আমাদের অভ্যাস |
দেশের ইকোনমি যখন ডুবু ডুবু সরকারকে বাধ্য হয়েই করতে হলো রাশ আলগা | ব্যাস ,ঘরবন্দী বাছারা আবার স্বাধীনতার স্বাদে হাবুডুবু | তখন কড়ায় গন্ডায় পাওনা উশুল করার অদম্য চেষ্টায় আবার সেই অভ্যাসের দাস সব বাধা নিষেধের গণ্ডী ভেঙে শুরু করলো ফুর্তির ফোয়ারা | মাস্ক পড়া মানুষ শুধু চিড়িয়াখানার বিষয় বস্তু তখন | তলা দিয়ে গোঁজা মেরে ৫০ এর সীমারেখা ৫০০ তে পৌছলো ছেলে মেয়ের বিয়েতে | আবার সেই চোর পুলিশের খেলা | যে দিলো আর যে নিলো বুঝলোনা অজান্তে মৃত্যু কিনলো তারা পৃথিবীর | আবার সেই একই ভাবনা ,”আমি অমর”| পাশের বাড়িতে মৃত্যু ঘুরে যাবে আমার দুয়ার মারাবেনা |
মাস্ক বাতুলতা ,সামাজিক দূরত্ব অপ্রয়োজনীয় | আমরা প্রত্যেকে তখন এক একজন মৃত্যুঞ্জয়ী হিরো কিংবা হিরোইন | ফলস্বরূপ ভয়াল রূপে বিস্তার করোনা | যে পোড়া দেশে ভাত জোটেনা দুবেলা , অশিক্ষা তৈরি করে অসাম্প্রদায়িক| সেইখানে অক্সিজেন ?
‘হায়রে সেলুকাস ,কী বিচিত্র দেশ’ পেটে ভাত নাই বা থাকুক ,কুশিক্ষায় ভরে যাক পৃথিবী ,ব্যাধি গ্রস্থ হোক প্রতিটি দেহ ,তবু মৃতদেহের উপর চেপে চলুক রাজনীতির মিছিল ,মন্তব্য ,বক্তব্য | আমরা যে অভ্যাসের দাস !
তাই আমাদের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিলো রাজ্যে রাজ্যে ভোট ,গণতন্ত্রের মিছিল | আর আজ আমরা অভ্যস্ত করোনা নামটিতে | আর ভয়ংকর লাগেনা ,আর ভয় হয় না ,আর ভাবনা হয়না | সহজ হয়ে উঠেছে মৃত্যু | নিজেদের হাতে দিনের পর দিন আধুনিক সভ্যতার হাতছানিতে জঙ্গলের পর জঙ্গল সাফ করে যে মানুষ অক্সিজেন কম করেছে পৃথিবীর আর নিজেকে মনে করেছে সর্বশক্তিমান !সেই মানুষই আজ প্রতি মুহূর্তের প্রার্থনায় চাইছে একমুঠো অক্সিজেন |
আমি সেই বিরল প্রজাতির জীব যে আজও ঘরে বসে লাশের ঢেরে বন্ধু স্বজনের পরিচিত লাশ ,ধুঁকে ,ধুঁকে বাঁচা দেখেও অভ্যাস বসে ভাবছি ,
চোর পড়েছে ওদের ঘরে ,আমার কি ?
আমি মৃত্যুঞ্জয় |
লোকের ছেলে যায় যাক শহীদ হতে ,
আমার ছেলে থাকে যেন দুধে ভাতে
আমি যে অভ্যাসের দাস ! করোনা আমার কাছে মাত্র একটি শব্দ ছাড়া আজ আর কিছু নয় |
————————