বিশের বিষ : চৈতালী মুখার্জী

বিশের বিষ
চৈতালী মুখার্জী

বিশের বিষ হজম করে আজ একুশে পা দিয়ে মনে হয়েছিলো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলম হয়তোবা | কে জানে ?
আশায় বাঁচে চাষা , নুতন আশা প্রাণে নিয়ে আমরাও আবার হয়তো হাঁটবো আরও কিছুটা পথ ! ততদিনে আবার হয়তো পৃথিবীর কোনও কোণে পুঞ্জীভূত বিষ মানুষের মনে | সেই বিষের ধোঁয়া ধীরে ধীরে অজান্তে এগোবে বিড়ালের থাবার মত নিঃশব্দে আবার শেষ করতে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ! আমরা নীরব দর্শকের মত আবার হজম করার লড়াই চালাবো, হয়তো টিকেও যাবো কিছু সংখ্যক | যারা পারবেনা তারা ইতিহাস |
এতদিনে বুঝেছি সব দর্প নিমেষে খর্ব করে ধুলায় মিশিয়ে দিতে লাগে শুধু কয়েকটা মুহূর্ত | সর্বশ্রেষ্ট জীব | তাই নিজেই ধংস করতে নিজের অস্তিত্ব উঠে পড়ে তৎপর |
পৃথিবীতে এমন নজীর বোধহয় আর নেই | নিজের প্রজাতির রক্ত,মাংস সেবন করে, এমন জন্তু বিরল বললেই চলে পৃথিবীর ইতিহাসে | আমার দুর্ভাগ্য আমি সেই কলঙ্কিত প্রজাতির একজন |
মনে পড়ে সেই দিনটা যেদিন উনিশ থেকে বিশে পা দিয়ে বড় হয়ে উঠলাম ! টিন এজ শেষ | হঠাৎ চারদিক থেকে কেমন সতর্কতা | যেন পাহারা ঘেরা দুর্গে বসবাস | ফিসফিস | বড় হওয়া মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নিতে ব্যস্ত সকলের চিন্তা ,কিভাবে হস্তান্তরিত করা যায় বিস্ফোরকটি | একটা মালিকানা মার্কা ট্যাগ লাগিয়ে লিখে দেওয়া ,সোলড আউট ,
বিষে বিষে জর্জরিত হওয়া পৃথিবী সেদিন খুঁজেছিল একুশ |
এসেছিল একুশ নব ফাগুনের বার্তা নিয়ে , একটু বড় হওয়া বড় হওয়া ভাব নিয়ে | একুশ কে বিশ্বাস করেছিলো মোটামুটি | তারপর সেই একুশেই একদিন যদিদং হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম | একবুক নিশ্বাস নিয়ে নুতন পথ চলার শুরুতে অনেক আশা ,অনেক স্বপ্ন সঙ্গী |
সময়ের চাকায় গড়াতে গড়াতে আজ ঘষে যাওয়া চাকায় আবার মনে পড়ে ফিরে দেখায় বিশ কে |
শুধুই কি গরল ? অমৃত কি লুকানো ছিলোনা ? হয়তো খুঁজে পেতে সময় লেগেছে ,পরিণত হতে হয়েছে | জীবন যা কিছু শিখিয়েছে সে মাত দিতে পারে কালকুট বিষ |
বাঁচার মন্ত্রে দীক্ষা | জীবনের ছোট ছোট খুশিগুলোকে নিয়ে বাঁচার প্রতীক্ষা, বাঁচার লড়াই | অনেক হারানোর মাঝেও পাওয়ার আকাঙ্খা ,যা বাঁচিয়ে রাখে মানব সত্তা |আজ আর তাই বিশ বিষ নয় অমৃতের সাধনা |
একটা ধাক্কায় অনেকটা বড় হয়ে যাওয়া ,অনেককিছু বুঝে যাওয়া ,অনেক কিছু মেনে এবং মানিয়ে নিয়ে একুশের বড় হওয়া বেশ আত্মতৃপ্তির ,বেশ জয়ের ,বেশ আনন্দের ,ভিন্ন স্বাদের |
বেশ মিল খুঁজে পাচ্ছি এই বিশের সাথে আমার বিশের | বিশে ছিলো উদ্দামতা , ভয় ,আশঙ্কা ,পরিচিত জীবনের গণ্ডীটা ছাড়িয়ে বড় হয়ে ওঠার অদম্য চেষ্টা ,নুতন করে বাঁচার এক যুদ্ধ |
হয়তো একটু অন্যরকম হলেও সকলেরই বিশে থাকে এক অদ্ভুত ভালোমন্দ মেশানো অনুভূতি | বড় হওয়ার যুদ্ধ ,একটা অদ্ভুত বিভ্রান্তি | অমৃতের আশায় বিশের বিষ পান হয়তো কমবেশী সকলেরই করা |
আজ ২১ এ সেই বিষের জ্বালা বহন করে নীলকন্ঠ হয়ে ওঠার চেষ্টা আমাদের হয়তো পরিপূর্ণ করবে ধীরে ধীরে | তবু মনের কোণে স্মৃতির অতলে উঁকি দেবে বিশ ! একাকী কোনও মুহূর্তে মনে পড়ে যাবে হারিয়ে ফেলা কিছু অমূল্য সাথী ,কিছু অমূল্য সময়, মানবসভ্যতার লজ্জাকর কিছু ইতিহাস |
তবুও প্রকৃতির প্রতিনিয়তের শিক্ষায় আমরা চল্লিশে পৌছে যখন পেছন ফিরে দেখবো তখন হয়তো পরিবর্তিত সত্তায় সঠিক বিচার করবো নিজেদের | ক্ষমা ,ভালোবাসা ,করুণার আলোয় বোধবুদ্ধির চেতনায় ,জরা ,ব্যাধি ,মৃত্যু ভুলে হবো তথাগত | এই আশা !