যশোরের ডিসিকে খোলা চিঠি; করোনা চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণে খুলনায় পাঠানো হোক।

করোনা মুক্ত হওয়ার পরে এম আইউব ভাইয়ের লেখা হুবহু তুলে ধরা হলো ;

যশোরের ডিসিকে খোলা চিঠি
করোনা চিকিৎসার সাথে সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণে খুলনায় পাঠানো হোক?

 

এ মাসের শুরুর দিকে জ্বরজ্বর অনুভব করি। কিন্তু তাতে স্বাভাবিক কাজকর্মে ব্যাঘাত হয়নি। দিন গড়ানোর সাথে সাথে জ্বরের সাথে মাথা যন্ত্রণা বাড়ে। প্যারাসিটামল শুরু করি। এক পর্যায়ে নাপা এক্সটেন্ড। সর্বশেষ, প্রেসক্লাব যশোরের নির্বাহী কমিটির মিটিংয়ে অনেক কষ্টে অংশগ্রহণ করি। মিটিং শেষে বাড়ি ফিরে আর উঠতে পারিনি। এরইমধ্যে সাংবাদিক সহকর্মী শহিদুল ইসলামকে ফোন করি ডাক্তার দেখানোর জন্য। তিনি দ্রুত যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছ থেকে প্রেসক্রিপশন করিয়ে দেন। সেইভাবে দু’দিন চলে।

দিন দিন অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। ১০ এপ্রিল পরিবারের সিদ্ধান্তে যমেক হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে যাই। সিদ্ধান্ত নিই কোভিড টেস্ট করানোর। সহকর্মীদের সহযোগিতায় নমুনা দিই। কিছু সময়ের মধ্যে পজিটিভ রিপোর্ট আসে। ভর্তি হই রেডজোনে।
এরপর শুরু হয় নামকাওয়াস্তে চিকিৎসা। আউটডোরের চিকিৎসকের ওষুধই ছিল ভরসা। অক্সিজেন সিলিন্ডার যেটি ছিল তা উল্লেখ করার মতো না। বেডে ওঠার পর দু’দিনে কোনো ডক্টরের দেখা মেলেনি। নার্সরা সবসময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছেন। রোগীর কাছে আসেননি বললেই চলে। অধিকাংশ নার্স এতটাই অমানবিক যে, নাভির ইনজেকশন দিয়েছিল পেটের পশম ধরে! তখন জীবন যায়যায় অবস্থা হয়। নার্সদের সাথে রোগীর লোকজন কথা বলার সুযোগ খুবই কম পান।
১১ এপ্রিল রাতে অক্সিজেন লেবেল কমে যায়। বেড়ে যায় শ্বাসকষ্ট। আমার স্ত্রীর কান্নাকাটি বেড়ে যায়। সংশয় বৃদ্ধি পায়। তখনও হাসপাতালের কোনো ডাক্তার-নার্স খোঁজ নিতে আসেনি। সকাল বেলা অক্সিজেন লেবেল ৫০ এর নীচে নেমে যায়। তখন আমার স্ত্রী নার্সদের জানালে তারা তার কাছে অক্সিমিটার দিয়ে অক্সিজেন লেবেল দেখতে বলেন। প্রথমবার দেখার পর দ্বিতীয়বার অক্সিমিটার চাওয়ায় নার্সদের অমানবিক জবাব ছিল,’বারবার দিলে ব্যাটারি শেষ হয়ে যাবে। ডাক্তার আসলে তখন দেখবেন।’ নিজেরা দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি। অক্সিজেন লেবেল কমে যাওয়ায় নার্সরা যেখানে আইসিইউ সাপোর্ট আছে সেখানে নিতে বলে দায়িত্ব শেষ করেন। স্ত্রী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। যোগাযোগ করে প্রেসক্লাব যশোরের সভাপতি শ্রদ্ধেয় জাহিদ হাসান টুকুন ও গ্রামের কাগজ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন ভাইয়ের সাথে। তারা যশোর সিএমএইচে আইসিইউর জন্য যোগাযোগ করেন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। যশোর থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে বললেও রেফার করার মতো কোনো ডাক্তার ১১ টা পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। অগত্যা প্রেসক্লাব প্রেসিডেন্টের শরণাপন্ন হয় আমার স্ত্রী। তিনি শেষ পর্যন্ত আরএমওকে ফোন করে খুলনায় রেফার করান। এরপর যোগাযোগ করা হয় খুলনার সাংবাদিক নেতা বন্ধুদের সাথে। তাৎক্ষণিক সামনে এগিয়ে আসেন সাংবাদিক নেতা এইচএম আলাউদ্দিন ও রাশেদুল ইসলাম। তাদের সহযোগিতা করেন বশির ভাই। তারা প্রাণপন চেষ্টা করে হাইফ্লো অক্সিজেনের ব্যবস্থা করেন। দেরি না করে অর্ধমৃত অবস্থায় স্ত্রী,ছোট বোন (ছোট ভাইয়ের স্ত্রী) ও ছোট ভাই ইমন অ্যাম্বুলেন্সে করে ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। চরম দুঃসময়ে ইমন সার্বক্ষণিক সাথে ছিল। সেখানে আগে থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন আলাউদ্দিন-রাশেদ ভাইয়েরা। তখন অবস্থা এতটায় আশংকাজনক ছিল যে সংশ্লিষ্টরা চরম উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
যাক সেসব কথা। যশোরের অবস্থার খবর এখানকার হাসপাতালের সুপার সাহেব রাখেন কিনা? তিনি একটিবারের জন্য রেডজোনে মুমূর্ষ রোগীদের খবর নিয়েছেন কিনা? জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মানুষের সাথে তার ডাক্তার – নার্সরা কী আচরণ করেন জানেন কিনা? বড় চেয়ার দখল করে রেখেছেন, মুমূর্ষ মানুষের সেবার ধারেকাছে যাচ্ছেন না। জবাব কী দেবেন? সৃষ্টিকর্তাও একজন আছেন।
করোনা কমিটির সদস্য সচিব সিভিল সার্জন কি কখনও মুমূর্ষ রোগীদের খোঁজ নিয়েছেন? আমি যতটুকু জানি আপনার কার্যক্রম সার্কিট হাউস আর ডিসি অফিসের এসির মধ্যে। এভাবে মুমূর্ষ মানুষের চিকিৎসা যশোরে হবে না। আপনারা আইসিইউ বেড করেছেন। সেন্ট্রাল অক্সিজেন প্লান্ট করছেন। তারপরও এগুলো অসুস্থ মানুষের কল্যাণে কাজে আসবে না। কারণ এখানে যারা আছেন তারা অমানবিক। আগে মানবিক করুন। প্রয়োজনে খুলনায় পাঠান তিন মাসের প্রশিক্ষণে। দেখে আসতে বলেন কীভাবে মানবিক হওয়া যায়।
ডিসি সাহেবকে বলবো, আপনি যশোরের অভিভাবক। এখানকার সবাই আপনার স্বজন। আপনার কোনো আপনজন যদি মুমূর্ষ হয় তাহলে আপনার যেমন লাগবে তেমনটি অনুভব করার অনুরোধ করছি কোভিড আক্রান্ত মুমূর্ষ রোগী হিসেবে। মাঝে মাঝে করোনা ওয়ার্ডের বাস্তব খবর নিন।
নতুন যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে সেটি যেন যশোরবাসীর কল্যাণে লাগে। সেখানেও সংশয় রয়েছে রোগী হিসেবে আমার। কারণ উপযুক্ত অপারেটর মিলবে বলে মনে করি না। খুলনা করোনা হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে ১০ জন রোগী ছিলাম। কয়েকদিনের মধ্যে আটজন চোখের সামনে মারা গেছেন। মহান মালিক দু’জনের হায়াতে তাইয়্যেবা দান করেছেন। তার একজন আমার মতো এই নাফোরমান বান্দা। কোনো অসত্য লিখিনি। বিষয়টি মানবিকভাবে গ্রহণ করার অনুরোধ করছি। আর যদি সেটি সম্ভব না হয় তাহলে যশোরে করোনা চিকিৎসা বন্ধ ঘোষণা করুন। এর ফলে মানুষ অন্য জায়গায় গিয়ে জীবন বাঁচাতে পারবে। চিকিৎসার নামে অকালে মরবে না!

এম.আইউব
কোভিডমুক্ত (২৫.০৪.২১)
ডেডিকেটেড করোনা হাসপাতাল,খুলনা।
চিফ রিপোর্টার, দৈনিক গ্রামের কাগজ, যশোর।
সময় : বেলা ১২.৩৫ মি.
সুজলপুর, সদর, যশোর।