কর্মচাঞ্চল্য নেই যশোরের শেখাটির পাখা পল্লীতে।

রাসেল মাহমুদঃ আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় মানবসভ্যতার পরিবর্তণ এখন বিশ্বব্যাপি।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে-সাথে তাল মিলিয়ে তেমনি এগিয়ে চলছে বাংলাদেশও। কিন্তু পরিবর্তনের কল্যাণে দেশ যেমন আধুনিকতায় পূর্ণতা পাছে। ঠিক তেমনি ভাবে যুগযুগ ধরে বয়ে চলা গ্রামবাংলার নানান ঐতিহ্য হারিয়ে যাছে একেএকে।
এসবের মধ্যে তালের পাতার তৈরি হাতপাখা এখন বিলুপ্তীর পথে। আধুনিক যন্ত্রের কাল্যাণে এখন ‘তুচ্ছো’ এক সময়কার তিব্র গরমের মানব শরীরের শান্তির পরশ বোলানো একমাত্র পন্থা তালপাতার তৈরি এই পাখার।
প্রচন্ড খরতাপে সৃষ্ট গরমে সব বয়সের মানুষের শরীরের ঠান্ডা বাতাসের পরশ বোলাতে তালপাতার এই হাতপাখার জুড়ি মেলা ভার। প্রাকৃতিক পন্থায় তৈরি হাতপাখার বাতাস সর্বশ্রেনীর মানুষের প্রাণ জুড়ালেও আধুনিক প্রযুক্তির এই যুগে কাজ নেই তালপাতার তৈরির এই হাতপাখার।
তাই ভালো নেই; নানা প্রতিকুলতার মাঝে টিকে থাকা হাতে গোনা গুটি কয়েক তালপাতা দিয়ে পাখা তৈরি শিল্প সংশ্লিষ্টরা। একদিকে চাহিদাহীন ওন্যদিকে মহামারি করোনার অগ্রাসন সব মিলিয়ে যেন থমকে গেছে পাখা তৈরি এই পল্লী। যশোর শহর থেকে আনুমানিক ২০-২৫ কিলোমিটার পূর্বে বসুন্দিয়া আফরাঘাট পার হয়ে শেখাটি গ্রামের বাদ্যকরপাড়ার আরেক নাম পাখা পল্লী। এক নামে পাখা পল্লী হিসাবে জিনলেও আগের মত এখন আর পাখা তৈরির কর্মযজ্ঞ।
সরেজমিন ঘুরে শেখাটির এই পাখাপল্লীর সবচেয়ে পুরানো ও বয়স্ক কারিগর মো: করিম খান ও জরিফ খানের সাথে কথা হয়। তারা জানান তালপাতা দিয়ে এই পাখা তৈরি কাজ করেন আজ প্রায় ৪০ বছরের বেশী সময় ধরে।
বংশিও পরমপরায় বাপ-দাদার কাজ এই পাখা তৈরি। তারা বলেন আমরা কোনো মতে এখনো এই ব্যবসা চালিয়ে যাছি। কিন্তু আমাদের সন্তানরা ছুটছে ওন্য কাজে কারণ মানুষের কাছে এর আর চাহিদা নেই।
তাই এপেশায় এখন আর পেটে ভাত জোটেনা। বাপ-দাদার রেখে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী প্রচীন শিল্পটি কোনো মতে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহে রিতীমত সংগ্রাম চালিয়ে যাছি।
শুধু করিম খান ও জরিফ খান’ই না এই পেশার মাথে জড়িয়ে রয়েছে এই পল্লীর আলম শেখ ও জিয়াউলের মত আরও ১৫-২০ জন ব্যক্তি। যা কিনা এক সময় পুরোগ্রামের বাসিন্দারা এই পেশায় জড়িত ছিলো।
মানুষের কাছে এখন আগের মত তালের পাখার চাহিদা না থাকা ও তাল গাছ বিলুপ্ত হওয়া সহ নানা কারনে গ্রামবাংলার প্রচীন এই ঐতিহ্যবাহী পেশা পাল্টে ফেলেছে এই পল্লীর বহু বাসিন্দা।
এপ্রজন্মের তালপাতার পাখা তৈরির আরেক কারিগর জিয়াউল বলেন বেশ কষ্টসাধ্য কাজ এটি।
আমাদের পাশাপাশি বাড়ির মহিলারাও রাতদিন সমান তালে পরিশ্রম করে চলে পাখা তৈরির কাজে। যদিও আগের মত এখন এই হাতপাখার ব্যবহার নেই; তবু কম বেশি যা চলে তাতে কোনো মতে পরিজন নিয়ে টানাপোড়নের মধ্যে চলতে হয় ভোরবছর।
বছরের ৩ মাস এই পাখার কিছুটা চাহিদা থাকে। চৈত্রমাসের শুরু থেকে জৈষ্ঠ্যর শেষ পর্যন্ত চলে তালপাতার তৈরি এসমস্ত হাতপাখার। আগে গ্রামগঞ্জ ঘুরে পাখা তৈরির জন্য তালপাতা সংরহ করতে পারলেও এখন মেলানো যায় না। এলাকা থেকে তালগাছ কেটে ফেলায় এখন গাছের সংকট দেখা দিয়েছে। আর যা আছে তার পাতা এখন টাকা দিয়ে কিনে নিতে হয়। আগের মত ফাউ পাওয়া যায় না। আস্ত একেক টা তালপাতা ৭-৮ টাকা দামে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কিনে নিয়ে আসতে হয়। তার উপর একটা পাতা থেকে ২টা পাখা তৈরি করা যায়। পাখা তৈরিতে সর্ব প্রথমে গাছ থেকে কাঁচাপাতা সংরহ করে এনে পানিতে জাগিয়ে পরে রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। এরপর হাতের মাপে পাতা ছাটাই করে ধাপেধাপে বাঁশের চটার শলা তৈরি করে তাতে হরেক রকমের রং করে শুকিয়ে নিয়ে গুটি শুতায় শেলায়ের মাধ্যমে একটি হাতপাখা বিক্রয়ের জন্য উপযোগী করে তোলার কাজ শেষ হয়। সব কিছু মিলিয়ে একেক টি পাখা তৈরিতে ১০-১২ টাকা পর্যন্ত খরচ পড়ে যায়। প্র¯তকৃত এই তালেরপাতার হাতপাখা পাইকাররা প্রকার ভেদে (অর্থাৎ বাঁশের হাতলের) ১২-১৪’শ ও ১৮-২২’শ টাকা করে ১শ’পিচ বিক্রয় করে। চৈত্র থেকে জৈষ্ঠ্য এই তিন মাসের আয় দিয়ে চলতে হয় বছরের অন্য দিন গুলো।