দৃশ্যটি আমাদের সবার চেনা : মাহমুদা রিনি

দৃশ্যটি আমাদের সবার চেনা : মাহমুদা রিনি

ও নেগেটিভ রক্ত লাগবে! রোগীর অবস্থা মরণাপন্ন, দ্রুত রক্ত চাই! এরকম আরো সারি সারি রক্তাক্ত মানুষ ছটফট করছে, আরো রক্ত দরকার! স্বেচ্ছাসেবীরা ছুটোছুটি করছে বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের সন্ধানে।
এক্সিডেন্ট! মুখোমুখি গাড়ির সংঘর্ষ। মর্গে দশটা লাশ। তিনজন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, আহতের সংখ্যা অগণন। একটা শিশুর পাঁজর ভেঙে গুড়িয়ে গেছে। একজন অন্তঃসত্ত্বা রমনীর পেটের ভিতর অর্ধমৃত শিশুটি দুমড়ে মুচড়ে উঠছে।
তার মা আর নড়াচড়া করছে না। রক্ত, রক্ত—- রক্তস্রোতে ভেসে যাচ্ছে সে, কয়েকটা দিন পরই তার জন্ম নেয়ার কথা ছিল। শুধু রক্তের স্বাদ-গন্ধ টুকু নিয়েই তাকে বিদায় নিতে হচ্ছে।
এক্সিডেন্ট, এম্বুলেন্স, রক্ত, হাসপাতাল মর্গে সারি সারি লাশ, উৎসুক জনতার ভীড় ঠেলে পিছনে তাকালে দেখা যাবে এদের একটা জীবন ছিল। এদের একটা পরিবার ছিল। সেই জীবনে কতরকম গল্প ছিল। এদের গৃহে স্বপ্ন ছিল, সেই গৃহে আপনজন অপেক্ষা করেছিল। কেউ হয়তো বাড়ি ফিরবে কতদিন পর! বাবা- মা, বোন- ভাই, প্রিয়তমা অপেক্ষা করে আছে।
কেউ হয়তো জরুরী কোন কাজে বেরিয়েছে। ছেলেমেয়েরা হয়তো সারারাত পড়া মুখস্থ করে পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। গাড়িতে কতগুলিই বা মানুষ কিন্তু তাদের স্বপ্নের পরিধি কত বিস্তৃত ছিল! একলহমায় সমস্ত স্বপ্ন, কর্ম, পরিকল্পনা ধ্বংস হয়ে গেল!
দুর্ঘটনা যারা ঘটায় তারা কি এসব মনে রাখে? হ্যাঁ আমি বলবো দুর্ঘটনা ঘটানো হয়। দুর্ঘটনা সুত্রের সুতো ধরে টান দিলে পায়ের তলা থেকে মাথা পর্যন্ত নড়ে উঠবে। এই দায়মুক্ত আমরা কেউ নই। আমি দায়ী, আপনি দায়ী, শ্রমিক দায়ী, মালিক দায়ী, পুলিশ- প্রশাসন, পথচারী, আমলা- মন্ত্রী, সরকার, পুরো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দায়ী। এই দায়বদ্ধতা গলায় ঝুলিয়ে, চোখ বন্ধ করে না দেখার ভঙ্গিতে কতদিন বাঁচবেন?
আপনার, আমার দিনটি যে আগামীকাল নয় কেউ বলতে পারে ? ঐ রক্তমাখা লাশের সারিতে আগামীকাল আপনি পড়ে থাকবেন না এর কোন নিশচয়তা আছে আপনার?
অতএব দায়বদ্ধতা স্বীকার করে নড়েচড়ে বসুন,
আমি আপনি সবাই। নয়তো যারা মর্গে শুয়ে আছে, যে শিশুটি মায়ের পেটের ভিতর ছটফট করছে, যাকে আপনি বাঁচতে দিলেন না তার দেখানো পথে আপনাকেও যেতে হবে।
আমি কবিতা লিখতে আসিনি, মর্গে শুয়ে থাকা সারি সারি লাশ, মায়ের পেটের ভিতর ছটফট করতে থাকা শিশুটির দাবি জানাতে এসেছি।
এই বেঁচে থাকা আমাকে অপরাধী করে দেয়।