না ফোটা কলির গল্প (২১) : কাঞ্চন চক্রবর্তী

না ফোটা কলির গল্প (২১)
কাঞ্চন চক্রবর্তী

সরকারী ভাবে যতটুকু চিকিৎসা দেয়া প্রয়োজন তাও ঠিকঠাক পেলনা, কারন ঔষধ লিখে দিলে টাকা দিয়ে ঔষধ কে কিনে দেবে? কিছু জিজ্ঞাসা করলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে, এমন অবস্থায় তনুর সব কিছু মনে পড়তে থাকে কিন্তু কাউকে কিছু বলেনা, কারণ যদি তার বাবার নাম প্রকাশ পায় তাহলে তার বাবার মান সম্মান সব ধুলোয় মিশে যাবে, তাই সে মনে-মনে ফন্দি আটতে থাকে যে ভাবেই হোকনা কেন তাকে এখান থেকে পালাতে হবে, একবার পুলিশ একবার ডাক্তারগন তার আসল ঘটনা জানার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে, কি বলবে সে?ভোর রাতে যখন মসজিদে আজানের ধ্বনি ভেষে আসছিল ঠিক তখন ডাক্তার নার্চের চোখ ফাঁকি দিয়ে টয়লেটে যাবার উদ্দেশ্য করে বেরিয়ে পড়লো পালানোর জন্য,কিন্তু শরীরটা এখনও পুরাপুরি ঠিক হয়নি,কাছে টাকা পয়সা নেই পা’দুটি ঠিক মত চলছেনা,তবুও হাল ছেড়ে দিলে চলবে না, কারন তার নিজের পাপের ফল তাকেই ভোগ করতে হবে, অনেক কষ্টে কমলাপুর রেল ইষ্টেশনে পৌছে গেছে তনু, কোথায় যাবে কি করবে কি খাবে কিছুই জানেনা তনু, জন্ম ঢাকাতে হলেও কোনদিন পায়ে হেটে কোথাও যায়নি সে,সামনে একটা ট্রেনে উঠে বসলো, ক্ষুদা তৃষ্ণায় কাতর তনু, কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেও জানেনা,হঠাৎ ঘুম ভেঙে দেখতে পেল সে যশোর এসে পৌছে গেছে,তড়িঘড়ি করে ট্রেন থেকে নেমে পড়লো তনু, ষ্টেশনে বসে নানা রকম চিন্তা এসে মাথায় চেপে বসলো, আমার রূপই আমাকে শেষ করেছে, আমার দেহটাকে ওরা সবাই মিলে খাবলে-খাবলে খেয়েছে, এই নষ্ট শরীর দিয়ে

না ফোঁটা কলির গল্প(২২)
আমি কি করবো? আমি তো যশোরের কোন কিছুই চিনিনা কার কাছে যাবো কে দেবে আমায় আশ্রয়,আর যেখানেই থাকিনা কেন আমার শরীর টাকে নষ্ট সমাজের পুরুষ মানুষ গুলি কুরে-কুরে খাবে, বিনিময় আমি কি পাবো? তার থেকে ভাল হবে মৃত্যু বরণ করা অথবা পতিতার খাতার নাম লেখা, কিন্তু পতিতালয় কোথায় কিভাবে কার কাছে জিজ্ঞাসা করবে!
হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো একজন পানের দোকানদারের কাছে গিয়ে বললো, চাচা আমার এক আত্ত্বীয়া হারিয়ে গেছে শুনেছি তাকে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, বলতে পারেন এখানে পতিতালয় কোথায়? এখান থেকে এককিলো মিটার পর মাড়োয়ারী মন্দিরের কাছে, এই রোড বেয়ে গেলে সোজা সামনে পড়বে,আচ্ছা ধন্যবাদ, তনু রেলরেড ধরে চলতে থাকলো কিন্তু পতিতা পল্লির কোন আলামত সে চোখে দেখতে পেলনা, তার হঠাত মনে পড়ে গেল মাড়োয়ারী মন্দিরের পাশে কেথাও হবে চায়ের দেকানদার বলেছিল, একজন পথচারী কে ডেকে বললো এখানে মাড়েয়ারী মন্দির কোথায় বলতে পারেন? পথচারী রসিকতা করে বললো কেন ওখানে কি পূজা দিতে যাবেন নাকি? হ্যা ও রকমই,হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল ঐ দেখুন, তনু রোড ক্রচিং করেই দেখতে পেল অনেক মেয়েরা অর্ধনগ্ন হয়ে রাস্তার পার্শে দাড়িয়ে আছে, আর পুরুষ মানুষ পেলেই হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে ভিতরে, এসব দেখে তনু বুঝতে পারলো যে এটা পতিতালয়,তনু কোনদিক না চেয়ে সোজা পতিতা

না ফোটা কলির গল্প(২৩)
পল্লীর ভিতরে চলে গেল স্থানীয় এক পতিতা বললো “এখানে পুরুষ মানুষ আসে জ্বালা জুড়ানোর জন্য কিন্তু এখন দেখি মেয়েরাও আসে জ্বালা জুড়ানোর জন্য” সে ব্যাঙ্গ করে কথাটা বলছিলে,তনু বললো “এখানে সর্দারিনীর ঘর কোনটি আপনি বলতে পারেন ?”মেয়েটি বললো “ঐ যে বৃদ্ধ মহিলা দেখছেন উনি আমাদের সর্দারিনী” তনু সর্দারিনীর সামনে এসে দাড়ালো, তনুকে দেখে সর্দারিনী অবাক হয়ে চেয়ে রইলো,এবং বললো “কে তুমি কার সাথে এসেছো? “আমি তনু, কারো সাথে আসিনি আমি একাই এসেছি” “কি চাই?” “আশ্রয়” “আশ্রয়? জানো এখানে মেয়েরা কি করে? আমি সব কিছু জেনে শুনে বুঝে তবেই এখানে এসেছি” কাজ করতে পারবে তো?” “কেন পারবো না? আমার অভ্যাস আছে” বাহ্ তবে তো কোন সমস্য নেই,আচ্ছা ঠিক আছে এসো আমার সাথে”(সর্দারিনী একটি ঘর দেখিয়ে) আজ থেকে তুমি এ ঘরেই থাকবে” “জী আচ্ছা,ও হ্যা এখান কার লেন দেনের হিসাব নিকাশ জানো তো?” “কি যে বলেন মা, আপনি আমার মায়ের মত আপনি যা বলবেন আমি তাতেই রাজি আছি” “তুমি আমাকে মা বলে ডাকলে কেন?” “আমার তো মা নেই তাই আপনাকে মা বলে ডেকেছি, আপনি কি তাতে রাগ করলেন?” সর্দারিনী কান্নায় ভেঙে পড়লো, আজ পঞ্চাশ বছর এখানে আছি কেউ আমাকে মা বলে সম্ভোধন করেনা, আর পতিতাদের কেউ মা বলে ডাকেনা সবাই মাগি বা বেশ্যা বলে ডাকে এই সর্ব প্রথম তুমি আমাকে মা বলে ডাকলে,আমিও মা হতে চেয়েছিলাম, চেয়েছিলাম স্বামী ঘর সংসার সন্তান, কিন্তু বিধিবাম

চলবে- – – – –