ঝিকরগাছার শিমুলিয়া মিশনে স্বাস্থ্য বিধি মেনে প্রার্থনা ও উপাসনা, হবে না কোন প্রকার মেলা

আজ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বড়দিন

ঝিকরগাছার শিমুলিয়া মিশনে স্বাস্থ্য বিধি মেনে প্রার্থনা ও উপাসনা, হবে না কোন প্রকার মেলা

আবুল কালাম আজাদ, ঝিকরগাছা (যশোর) থেকে : আজ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব “বড়দিন”। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ৩নং শিমুলিয়া ইউনিয়নের শিমুলিয়া মিশনে করোনাকালীন সময়ে বড়দিন উপলক্ষ্যে শিমুলিয়া মিশনের পাশে প্রতিবারের ন্যায়ে এবার বাচ্চাদের নাগরদোলা, চরকা সহ বিভিন্ন ধরণের খেলা, মহিলাদের জন্য কেনাকাটার ব্যাপক আয়োজন, ঘরসাজানোর বিভিন্ন আসবারপত্র এবং মেলার বিশেষ আকর্ষণ সদর ঘাটের মিষ্টি মাখা পান আর থাকছে না। হচ্ছে না কোন প্রকার মেলা বা অনুষ্ঠান। স্বাস্থ্য বিধি মেনে শুধু মাত্র প্রার্থনা ও উপাসনায় উৎসব পালন করা হবে।
বড়দিন উপলক্ষ্যে শিমুলিয়া মিশনের সভাপতি ফাদার ডমিনিক হালদারের নিকট খ্রিস্টান ধর্মের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, সময়ের আর্বতে বড়দনি আজ পেয়েছে সার্বজনীন উৎসবরে আবহ। তবে শুরু থেকেইে কিন্তু এমন ছিল না। যিশু খ্রিষ্ট, যার জন্মদিন উপলক্ষ্যে বড়দিন পালন করা হয়। তার মৃত্যুর বহু বছর পর থেকে শুরু হয় এই উৎসব পালন। প্রায় দুই হাজার বছর আগে মাতা মেরি (বিবি মরয়িম) গর্ভে জন্মে ছিলেন যিশু। তবে যিশুর জন্ম হয়েছিল অলৌকিক ভাবে। মেরি ছিলেন ইসরাইলের নাজারেথবাসী যোসেফের বাগদত্তা। সৎ, ধর্মপ্রাণ ও সাধু এই মানুষটি পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি।
একদিন এক স্বর্গদূতের (ফেরেস্তা) কাছ থেকে মরিয়ম জানতে পারেন, মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে তাঁর গর্ভে আসছেন ঈশ্বরের পুত্র। দূত শিশুটির নাম যিশু রাখার নির্দেশ দেন। বিয়ের আগেই মেরির সন্তান হচ্ছে জেনে ধর্মপ্রাণ যোসেফ খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন গোপনেই ত্যাগ করবেন মেরিকে। কিন্তু সেই স্বর্গদূত এসে যখন ঈশ্বরের পরিকল্পনা যোসেফের কাছে খুলে বলেন, তখন যোসেফ রাজি হয়ে যান মেরিকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে। যোসেফের গ্রাম নাজারেথ ছিল জুদেয়া রাজ্যের একটি শহর। রাজার নির্দেশে তখন রাজ্যজুড়ে চলছে আদমশুমারির কাজ। কর দেওয়া ও নাম লেখানোর জন্য হাজার হাজার মানুষ বেথেলহেমে যান। মেরিকে গাধার পিঠে বসিয়ে যোসেফও রওয়ানা দেন বেথেলহেমে। পথেই মেরির গর্ভবেদনা ওঠে। রাজ্যের মানুষের ভিড়ে বেথেলহেমের কোনো শহরে জায়গা হয় না তাদের। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে সন্তান জন্মদানের জন্য মেরিকে এক গোয়াল ঘরে ঠাঁই নিতে হয়। সেখানেই জন্ম নেন যিশু। যিশুর জন্মের অনেক বছর পর থেকে খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীরা এ দিনকে আনন্দ ও মুক্তির দিন হিসেবে পালন করতে শুরু করে।
২৫ডিসেম্বর বড়দিন পালন করা হয় বলে অনেকের ধারণা এই দিনেই যিশু খ্রিষ্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই ধারণা ঠিক নয়। প্রকৃতরূপে যিশুর জন্মগ্রহণের সঠিক দিন-ক্ষণ পাওয়া যায় না। ২০০খ্রিষ্টাব্দের দিকে মিসরে একদল মানুষ যিশুর জন্মদিন পালন শুরু করে। ২২১খ্রিষ্টাব্দে মিসরের একটি দিনপঞ্জিতে লেখা হয়েছিল, মা মারিয়া ২৫মার্চ গর্ভধারণ করেন। এ বিষয়টি রোমান ক্যালেন্ডারেও ছিল। এ ক্যালেন্ডারে সূর্যদেবতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের উৎসবের কথাও রয়েছে। ইতিহাস রয়েছে, ৩৩৬খ্রিস্টাব্দে রোমে সর্বপ্রথম বড়দিন উৎযাপন শুরু হয়। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যান্য দেশেও। ৩৫৪খ্রিষ্টাব্দের রোমান ক্রমপঞ্জিতে ২৫ডিসেম্বর যিশুর জন্মদিন উল্লেখ করে দিনটিকে যিশুর জন্মদিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
পরবর্তীতে ৪৪০সালে পোপ একে স্বীকৃতি দেন। মধ্যযুগে বড়দিন উৎসব আরো জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ৮০০খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে জার্মানির রাজা রোমান সম্রাট হিসেবে গির্জা কর্তৃক মুকুট ধারণ করেন। ১০০০খ্রিষ্টাব্দে রাজা সেন্ট স্টিফেন হাঙ্গেরিকে খ্রিষ্টান রাজ্য ঘোষণা করনে। ১০৬৬খ্রিস্টাব্দে রাজা উইলিয়াম ইংল্যান্ডের মুকুট ধারণ করেন। ক্রিসমাস উৎসব প্রসারে এগুলো বেশ প্রভাব ফেলে। তবে প্রটেষ্টান্ট সংস্কারের সময় একদল লোক বড়দিন পালনের বিরোধিতা শুরু করে। তাদের অভিযোগ, উৎসবটি পৌত্তলিক এবং ধর্মীয়ভাবে এর কোনো তাৎপর্য নেই। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইংল্যান্ডের গোঁড়া শাসকরা ১৬৪৭সালে বড়দিন উৎসব পালন নিষিদ্ধ করে। অবশ্য একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর এ নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। বর্তমানে শুধু ক্যাথলিক নয়, প্রটেষ্টান্টরাও এ উৎসব পালন করে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ২৫ডিসেম্বর বড়দিন পালিত হলেও রাশিয়া, জর্জিয়া, মিসর, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও সার্বিয়ায় ব্যতিক্রম। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের জন্য এ দেশগুলোতে ক্রিসমাস পালতি হয় ৭জানুয়ারি।
উত্তর ইউরোপীয়রা যখন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে তখন পৌত্তলিকতার প্রভাবে ক্রিসমাস শীতকালীন উৎসবের মতো পালন শুরু হয়। ফলে সেখানকার এ উৎসবে শীত উৎসবের অনুষঙ্গও জড়িত হয়েছে। এখন পর্যন্ত স্ক্যান্ডিনেভীয়রা এ দিনটিকে ‘জুন’ উৎসব বলে থাকে। পূর্বদেশ অর্থাৎ এশিয়া মাইনরের দেশগুলোতে ৬জানুয়ারি এ উৎসব পালন করা হয়। ৬জানুয়ারি যিশুর ব্যাপ্টিজম বা দীক্ষাস্নান দিবস। দিনক্ষণ সঠিক ভাবে জানা না গেলেও, বড়দিন উদযাপন বর্তমানে এক সার্বজনীন রূপ পেয়েছে। প্রায় দুই হাজার বছর আগে যিশু খ্রিষ্ট মানুষকে দেখিয়ে ছিলেন মুক্তি ও কল্যাণের পথ। বড়দিনে তাই তাকে গভীর ভাবে স্মরণ করে সারাবিশ্বের খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। বড়দিন উপলক্ষ্যে সবাইকে জানাই শুভ বড়দিন ও ইংরেজী নববর্ষের অগ্রীম শুভেচ্ছা।