রক্তের টান : নিলাশা আফরিন মৌ

রক্তের টান
নিলাশা আফরিন মৌ

অনুগল্প

বাবা বাবা মা কেমন যেন করছে একটু তাড়াতাড়ি আসো না।
শরিফ সাহেব তাড়াহুড়ো করে দৌড়ে সালেহা বেগমের রুমে আসলো। খুব শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ,কথা বলতে পারছে না।
___কি হয়েছে সালেহা তোমার খুব কষ্ট হয়েছে কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলো আমাকে বলো না ?কি হয়েছে তোমার?

____পরশের বাবা আমি মনে হয় আর বাঁচবো না আমার নিঃশ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে দম বন্ধ হয়ে আসছে……..

আর কোন কথা বলতে পারলেন না সালেহা বেগম জ্ঞান হারালেন শরিফ সাহেব তাড়াতাড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে গেল। সালেহা বেগম কে ডাক্তার দেখলো এবং অনেকগুলো টেস্ট দিল ।সালেহা বেগমের ৩ ঘণ্টা পর রিপোর্ট এলো। ডাক্তার দুঃখের সঙ্গে জানালেন

___সালেহা বেগমের ক্যানসার ধরা পড়েছে উনি আর বেশিক্ষণ বাঁচবেন না।

পরশের বয়স ১০ বছর আর মনি ছোট মেয়ে ছয় মাস। বয়স শরিফ সাহেব টাকা পয়সার কোন অভাব নেই, কিন্তু সে টাকা দিয়ে আর কি হবে কি লাভ তার এত টাকা পয়সা দিয়ে যে টাকা দিয়ে তার ভালোবাসার মানুষ তার স্ত্রীকে বাঁচাতে পারবে না।

মনকে শক্ত করে শরিফ সাহেব সালেহা বেগমের সাথে দেখা করতে ICU তে গেলো, নাকে অক্সিজেন মাক্স হাতে স্যালাইন দেখে শরিফ সাহেব চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলেন না। বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছিল তবুও মনটাকে শক্ত করে নিয়ে তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন। সালেহা বেগম কে সান্তনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন ।

___তোমার কিছু হতে দেবনা ছালেহা আমি যেভাবেই হোক তোমাকে আমি বাঁচাবো তোমাকে ছাড়া যে আমার সংসারটা শুন্য। সালেহা বেগম বলল

__ পরশের বাবা আমি আর বাঁচবো না আমি জানি আমি ডাক্তারের সব কথা শুনেছি তুমি আমার ছেলেমেয়েদের দেখো। ওদের কোন কষ্ট হতে দিও না।ওরা ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকবো।

কথাগুলো বলা শেষ না হতে উপরদিকে বড় নিঃশ্বাস নিয়ে নিঃশ্বাসটা ছেড়ে দিলেন।
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
শরিফ সাহেব তার বুকের ওপরে মাথা রেখে অনেক কান্নাকাটি করার পরে মনটাকে শক্ত করে নিয়ে তার স্ত্রীর শেষ কার্য সম্পন্ন করলেন ।
বাসায় ফিরে দেখল পরশ না খেয়ে ঘুমিয়ে গেছে, ছোট মেয়ে মনি অনেক কান্না করছে কাজের মেয়েটাকে কোন মতেই সামলাতে পারছে না ।কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না এভাবে কেটে গেল বেশ কিছুদিন ।এর মধ্যে বাসার কাজের মেয়ে পরশ মনিকে মায়ের ভালোবাসা দিয়ে সামলে নিয়েছে। কাছে টেনে নিয়েছে এখন পরশমনি জেদ করে না আর অনেক খুশি আছে।

কাজের মেয়ের কাছে যেন তার মায়ের ভালবাসাটাই পাচ্ছে।
কাজের মেয়ের বয়স বেশি না ২৫-২৬ হবে ।
শরিফ সাহেব পরশমনি ভালবাসতে দেখে ভাবল যদি কোনো কারণে কাজের মেয়েটা চলে যায় তাহলে ছেলেমেয়েগুলো আবার কষ্ট পাবে। তাই শরিফ সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন কাজের মেয়েকে বিয়ে করবে।
ময়না কে বিয়ের প্রস্তাব দিলে, ময়না রাজি হয়ে যায়। কারণ বাচ্চাগুলোকে অনেক ভালোবাসে। খুব খুশি হয় তারা ,আবার মা পেল ।

বেশ কিছু দিন এভাবে হাসি খুশি সুখে কাটছিল তাদের দিনগুলি ।
মাঝে ৮ বছর পেরিয়ে গেল, এখন পরশের বয়স ১৮ বছর আর মনির বয়স ৮ বছর ।
ময়না মা হতে চলেছে দু একদিনের মধ্যে ডেলিভারি হবে ।শরিফ সাহেব ব্যবসার কাজে সারাদিন বাড়ির বাহিরে থাকে, বাসায় সময় দিতে পারে না।

হঠাৎ পরশমনি জীবনের নামলো আঁধার কালো সময়। ময়নার বাচ্চা হবার পর ময়না আর পরশমনি রাখতোনা মনিকে দিয়ে বাড়ির সমস্ত কাজ করাতো পরশকে দিয়ে বাজার করা তো তাদেরকে স্কুলে পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছিল ।
শরিফ সাহেব ব্যবসার কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে এসবের কিছুই নজরে আসেনি । ঠিকমতো খাবার দিত না ,কিন্তু এসবের কিছুই পরশ মনি তার বাবাকে বলেনি কারণ মাকে অনেক ভালবাসত ময়না ওদেরকে ছেলে মেয়ে ভাবল পরশমনি তাকে কখনো সৎ মা ভাবেনি মুখ বন্ধ করে সব সহ্য করে গেছে ।
ময়নার করে একটি পুত্রসন্তান হয়েছে।
শরিফ সাহেব খুব খুশি দুই ছেলে এক মেয়ে কত সুখী পরিবার ।
শরিফ সাহেব মনে মনে হাসে কিন্তু পরশ মনির কষ্টের কথা তিনি তো কিছুই জানেনা মনি জন্মের পর তার মাকে হারিয়েছে তাই ময়নাকে মা জানে ।তাই মনি তার ছোট ভাইকে খুব ভালোবাসে যদিও ময়না মনিকে তার ছোট ভাইয়ের কাছে ঘেষতে ও দেয় না। তবুও দূর থেকে মনি ছোট ভাইকে জীবন দিয়ে ভালবাসে ।

ছোট ছেলের বয়স যখন তিন মাস যখন ময়না ও শরীফ সাহেব তাদের ছোট ছেলের মাঝে কিছু প্রবলেম লক্ষ্য করে। তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে এবং জানতে পারে দুটো কিডনি ড্যামেজ জন্ম থেকে ।আর যদি শীঘ্রই কিডনি না যাওয়া যায় তাহলে ময়নার ছেলেকে বাঁচানো যাবে না ।
শরিফ সাহেব চিন্তায় পড়ে গেল কি করবে ভেবে পাচ্ছিল না। এত তাড়াতাড়ি কিভাবে কিডনি পাবে আর শুধু পেলেই হবে না ময়নার ছেলের সাথে ম্যাচ করতে হবে ।
ময়না শরিফ সাহেব বললো যে ভাবেই হোক তার ছেলেকে বাঁচাতে হবে।পরশ মনি তার মায়ের কান্না সহ্য করতে পারলো না ।
ময়না নিজের সন্তান মনে না করলেও পরশমনি তার মাকে নিজের মা ভাবে। তাই ময়নার চোখের পানি তাদের সহ্য হলো না ।
পরশ মনি ডাক্তারকে বললো তাদের কিডনি ম্যাচিং করে কিনা দেখার জন্য। তারা সিদ্ধান্ত নিলো দুইজন দুটো কিডনি ছোট ভাইকে দেবে।ডাক্তার বলল

_____তোমরা অনেক ছোট তোমাদের কাছ থেকে কিডনি নেওয়া সম্ভব না। আর তারপরে তোমার বাবা-মা জানতে পারলে আমাকে আস্ত রাখবে না।

পরশমনি ডাক্তারের হাতে পায়ে ধরল এবং বলল

__আমার ভাই মারা যাবে আর আমরা বেঁচে থাকবো এটা হতে পারে না ডাক্তার আংকেল প্লিজ না করবেন না ।

ডাক্তার ও তাদের কাকুতি-মিনতি ফেলতে পারলেন না তাদের ব্লাড টেস্ট করল এবং ময়না ছোট ছেলের সঙ্গে তা ম্যাচিং করল ।ম্যাচিং হল দুজনেরই ।

____আঙ্কেল কে কিডনি দিয়েছে এ কথাটা আমার বাবা-মাকে এখনই বলবেন না। বললে উনারা রাজি হবে না।
ডাক্তার তাদের অপারেশনের ব্যবস্থা করলো আর পরশমণির মাকে জানিয়ে দিলাম কিডনি পাওয়া গেছে।

অপারেশন হলো এখন তিন ভাইবোনের সুস্থ আছে।

শরীফ ও ময়না ডাক্তারের কাছে জানতে চাইলেন তাদের এত বড় উপকার কে করল ।ডাক্তার বলল বলতে নিষেধ করেছে। তবুও ময়না হাতে-পায়ে ধরল ডাক্তারের অবশেষে জানান তাদের বড় ছেলে ও মেয়ে মনি কিডনি দিয়ে বাঁচিয়েছে ছোট ছেলেকে ।

ময়না অবাক হয়ে গেল এবং নিজের সন্তান দেখতে না গিয়ে আগে পরশ মনি কে দেখতে চাই ।ডাক্তার শরীফ সাহেব এবং ময়নাকে পরশ মণির কেবিনে নিয়ে গেল। ময়না কান্না করতে করতে পরশমনি কে বুকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলেন আর ভুল স্বীকার করলেন।
শরীফের কিছু বুঝতে পারছিল না ,কেন পরশ মনির কাছে ক্ষমা চাইছে ।
ময়না শরিফ সাহেব কে সব খুলে বলল শরিফ সাহেব রেগে কেবিন থেকে বের হয়ে গেল ।
অনেক কষ্ট পেল শরিফ সাহেব ।
কিন্তু পরশ তার বাবাকে ডেকে সব বুঝিয়ে বলল এবং ময়নাকে ক্ষমা করে দিতে বললো ।আর বলল বাবা আমরা তিন ভাইবোন এখন একসাথে পড়াশোনা করব। একসাথে খেলব একসাথে ঘুমাব এক সাথে খাবো। আমাদের মাঝে আর কোন কষ্ট থাকবে না।

ময়না বলল হ্যাঁ বাবা ঠিকই বলেছো তোমরা তিনজনেই আমার ছেলেমেয়ে আর এখন থেকে আমি তিন জনকে সমানভাবে ভালোবাসবো ‌।
বিগত দিনগুলোর জন্য আমি লজ্জিত আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দিও ।বাবা আর কখনো এরকম ভুল আমি আর করব না।
শরিফ ময়না এবং তিন ছেলে মেয়েকে নিয়ে তারা অনেক সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে।

সমাপ্ত____