ঐতিহ্যবাহী শান্তিরহাট বাজার স্থাপন ও নামকরণের ইতিহাস

মো: মজিবুলহক, জোরারগঞ্জ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: মীরসরাইয়ে রায় বাহাদুর গোলক চন্দ্র রায় চৌধুরী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মহাজনহাট ভাঙ্গা ও সাথে সাথে ধুমের শান্তিরহাট (বাজার) স্থাপনের ইতিহাস যাহা বঙ্গ-ভারতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন।

মীরসরাই থানার উত্তরাঞ্চলের মহাজনহাট বাজারে সেইসময় বিক্রেতাদের পণ্যের উপর সাতবার কর তোলা হতো। জমিদার বাড়ির মালি, হাতির মাহূত, ঝাড়ুদার, ঠাকুর ফুলমালি, পুরহিত সহ সাতজনের জন্য প্রতিটি পণ্য থেকে একবার করে কর তোলা হতো। এই নিয়ে বাজারে আগত পণ্য বিক্রেতাদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিলো।

জনশ্রুতি আছে, সোনাপাহাড় এলাকা থেকে জনৈক দরিদ্র বিধবা মহিলা আট মুঠো ঢেকিশাক বিক্রির জন্য মহাজন হাটে আসে। শাক বিক্রি করে বাবা-মা ও ছোট ভাই-বোনদের জন্য চাল-ডাল নিয়ে যাবে। কিন্তু হাটে বসবার পর জমিদার বাড়ির মালি, মাহুত, ঝড়ুদার এভাবে সাতজন এসে তাদের ভাগের সাত মুঠো শাক নিয়ে যায়। বাকি এক মুঠো শাক নিয়ে বিধবা মহিলাটি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সাত/আট মাইল দূর থেকে আসা আসহায় দরিদ্র মহিলাটির দু:খে সমবেদনা জানায় হাটের ক্রেতা-বিক্রেতারা। ধীরে ধীরে দীর্ঘ দিনের চাপা ক্ষোভ এই পর্যায়ে বিক্ষোভে রূপ নেয়।

কেউ একজন প্রস্তাব করলো জমিদারকে বিষয়টি জানাতে, মুহূর্তে শত-শত লোক জড়ো হলো জমিদার বাড়ির সদর দরজায় হৈ চৈ শুনে জমিদার বেড়িয়ে এলেন। সমবেত জনতা বিষয়টি জমিদারকে জানায় কিন্তু জমিদার হাটের মানুষদের উপহাস করলেন এবং বললেন – “পোষালে এই বাজারে থাক না পোষালে অন্যত্র চলে যাও এখানে এই নিয়মই বহাল থাকবে”। জমিদারের জবাব শত-শত লোকের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, উত্তেজিত জনতা সাথে সাথে হাট ভেঙ্গে দেয়। জামালপুর নিবাসী নবী মিয়া ও মোবারকঘোনা নিবাসী সোলতান মিয়া এই ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এলাকার প্রবীনদের মতে, ১৯১৪ কিংবা ১৯১৫সালের দিকে এই ঘটনা ঘটেছিল, শত-শত লোক দোকান ভাঙ্গে এবং হাটের লোকজন সবাই চলে যায়, হাট জনশূন্য হয়ে পড়ে। উত্তেজিত জনসাধারণ ধনশালী ব্যক্তি কামিনী সাহার কাছে যায়- মহাজন হাটের সামান্য দক্ষিণে তাদের বাড়ি। বিত্তশালী কামিনী সাহার সাথে সম্পত্তি নিয়ে রায় বাহাদুর গোলক চন্দ্রের ছেলেদের মামলা চলছিল। কামিনী সাহার কাছে শত শত মানুষ এসে বাজার প্রতিষ্ঠার জন্য জায়গা চান। জমিদারদের সাথে বিরোধ থাকলেও তিনি তুলাতুলিতে বাজার প্রতিষ্ঠার জন্য জমি ছেড়ে দেন। জনসাধারণ সেখানে রাতারাতি মাটি কেটে, ঘর তুলে বাজারের উপযোগী করে হাট বসায়।

কিন্তু জমিদারের তরফ থেকে ভাঙ্গার অভিযোগ এনে এলাকার ৯৫ (পচানব্বই) জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ৯৫ জন আসামীর মধ্যে আব্দুস সাত্তার, সোনা মিয়া, আহসান মিয়া, সেকান্দার চৌকিদার, সৈয়দ মিয়া অন্যতম। ধুম, মোবারকঘোনা, নাহেরপুর, জামালপুর, পরাগলপুর, ইমামপুর, সোনাপাহাড় এইসব মৌজার দরিদ্র মানুষদের মামলার আসামী করা হয়। জমিদারদের পক্ষ থেকে ঘোষনা দেওয়া হয় তাদের বাড়ির চার মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে যেন কোন বাজার না বসে। যারা জায়গা দিবে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। এই কারণে তুলাতুলিতে সাহাদের দেয়া জমিতে বাজারটি অবশেষে বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর নাহেরপুর চৌধুরীদের দেওয়া জমিতে হাট বসে, জমিদার গোষ্ঠি চৌধুরীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, বর্তমানে যেখানে শান্তির হাট সেখানেও বাজার স্থাপন করে জনসাধারণ। এই বাজারটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিক্ষুব্ধ প্রজারাও তাদের জীবন-মরণ সমস্যা হিসাবে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ঐক্যবদ্ধ থাকে। তাদের প্রতিজ্ঞা যত দুঃখ-কষ্ট হউক না কেনো মহাজন হাটে তারা আর ফিরে যাবে না। বিভিন্ন মৌজার মানুষ সমবেতভাবে একের পর এক একেক স্থানে বাজার প্রতিষ্ঠা করে কিন্তু আইনের মাধ্যমে জমিদারের রক্তচক্ষুর কাছে তাদের হার মানতে হয়।

সন্দ্বীপ, হাতিয়া, ভোলা, বরিশাল, সোনাগাজী, ফেনী, মহেশখালী ও চট্টগ্রাম এমনকি কোলকাতা ও বার্মার আকিয়াব রেঙ্গুনের সাথেও ব্যবসা বাণিজ্য ছিল এই অঞ্চলের মানুষের। আর তাই অতি শীঘ্রই একটা বাজার প্রতিষ্ঠা করে এই অঞ্চলের মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হবে। আর জমিদার গরীব সাধারণ প্রজাদের বিরুদ্ধে মামলা করে যাতে তারা চট্টগ্রামে গিয়ে মামলায় হাজিরা দিতে না পারে বা উকিল নিয়োগ করে জমিদারের দেওয়া ঘোষনাকে অবৈধ ও অকার্যকর করতে না পারে, কিন্তু বাজারতো প্রতিষ্ঠা করতে হবেই।

আশার আলো ও সহযোদ্ধার আবির্ভাব: স্থানীয় জনসাধারণ এক সভায় মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেয় বাজার নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করবে এবং এজন্য এক কানি জমি প্রয়োজন। এক কানি জমি কিনে তাতে বাজার বসালে জমিদারদের কিছু করার থাকবে না। কিন্তু জমি দেবে কে?? কেনার টাকাই বা কোথায়??? সবাই মিলে ছুটলো মঘাদিয়া’র জমিদার নুরুল আবছার চৌধুরী ওরফে কেনু মিয়া চৌধুরীর কাছে। সবাই অনেক আশা নিয়ে গেল তার বাড়িতে। শত শত লোক জামায়েত দেখে তিনি এগিয়ে এলেন। জানতে চাইলেন জনসমাগমের কারণ।

তিনি এইসব ব্যাপার জানতেন, বিস্তারিতভাবে তার কাছে আবেদন জানানো হল। এবং উত্তরাঞ্চলের শত শত পরিবারের দুঃখ-কষ্টের কাহিনী শুনে তিনি বললেন; এক কানি জমিতে একটা বড় হাট হবেনা। তাই ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করতে হবে, প্রতিশ্রুতি দিলেন তিন কানি জমি তিনি কিনে দেবেন। মানুষ যাতে জমি বিক্রিতে রাজি হয় এজন্য তিনি বেশী দাম দিতে রাজী হলেন। সেসময় জমির কানি (বিশ গন্ডা) ছিল সর্ব্বোচ্চ ৫০০টাকা। কেনু মিয়া চৌধুরী জমির কানি ১,২০০টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেন। বেশি দাম পেয়ে অনেকে জমি বিক্রি করে দিতে রাজী হল। তিন কানি জমি তিনি ৩,৬০০টাকায় কিনে দেন।

কিন্তু বাজারের নাম কি হবে? সবাই ধরলো বাজারটি তার নামে করতে। কিন্তু জনদরদী ও প্রজাহিতৈষী জমিদার কেনু মিয়া চৌধুরী বললেনঃ “অশান্তির পর শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাই বাজারের নাম হবে “শান্তির হাট”। এদিকে মহাজন হাটের জমিদারের পক্ষ থেকে শান্তির হাট বাজার প্রতিষ্ঠা করে দেওয়ার জন্য কেনু মিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে মহাজন হাট বাজার ভাঙ্গা ও প্রজা ক্ষেপিয়ে তোলার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করে। এই নিয়ে আদৌ চিন্তিত হলেন না জনদরদী জমিদার কেনু মিয়া চৌধুরী। তার সাথে বছরের পর বছর ধরে মামলা চলতে থাকে।

অবশেষে কেনু মিয়া চৌধুরীর নামে আদালত থেকে এগারো হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ রায় জারী করা হয়। হাজার হাজার মানুষের উপকার ও স্বাচ্ছন্দে জীবন যাপনের সুবিধার্থে তিনি সে টাকা শোধ করেছিলেন। কেনু মিয়া চৌধুরী সাধারণ মানুষের কল্যানের জন্য যে অবদান রেখেছেন তার কোন তুলনা হয় না। আজকের দিনে বিচার করলে এই টাকা হয়তো কিছুই নয়। কিন্তু সেই সময়ের জন্য তা অবশ্যই অনেক কিছু।