জলের ধারা : মাহমুদা রিনি

জলের ধারা
মাহমুদা  রিনি
জলের ধারা আর জীবন ধারা পরস্পর বিপরীত মুখি,
আমি জলের দলে মিশে যাই।
নিন্মমুখি বয়ে যাওয়া জলের স্বভাব, জন্ম যতই
গিরিরাজ্যে পাহাড় চুড়োই হোক না কেন—
সে আপন মনে ছুটে চলে মাটির বুকে, বিলিয়ে
দেয় নিজেকে সবুজারণ্যে।
ময়ূর সজ্জিত সমাজে আমিও কাকের মত—-
আলো ঝলমলে শিক্ষিত, বিশুদ্ধ ইংরেজি বাংলার
আধুনিক উচ্চারণের ভীড়ে বড় নিস্প্রোভ অসহায়
মনে হয়।
আমি সেই মেঠোপথে হাটি, যে আলপথ ধরে গাঁয়ের
কৃষাণ কৃষাণী দিনভর হেঁটে চলে।
আমি তখনো থাকি সখিনার পাশে, যার ভাত ফুটতে
দেরী হলো বলে— এক তালাক, দুই তালাক,
বাইন তালাক দিয়ে দিল স্বামী।
ভাতের হাড়ি তখনো চুলোয়, সখিনা ছেলে কোলে এক
কাপড়ে নেমে এলো রাস্তায়—-।
আমি ঐ ধর্ষিতা কিশোরীর পাশে অপলক চেয়ে রই, যাকে—
নেকড়েরা ছিড়ে খেয়েছে গত রাতে।
বেশ্যার মধ্যরাতের ঘর্মাক্ত নোটের হিসাব করা দেখি,
দেখি কিভাবে—
বর্ণহীন অচ্ছুৎ পল্লির মেয়ে বধূরা রাত্রির অন্ধকারে সমাজপতিদের
চোখে পূত পবিত্র দেবী হয়ে ওঠে।
যাদের হাতের জল অস্পৃশ্য, কিন্তু শরীর লোভনীয় সুস্বাদু——-।
আমি সেই সব জরিনা, করুণা, রাবেয়ার যৌতুকের
বলি হয়ে আগুনে ঝলসানো নির্মম গল্প শুনি,
শুনতে শুনতে ভুলে গেছি সভ্য মানুষের ভাষা।
এখন আমি শুধু কান্নার শব্দ শুনতে পাই,
মজলুমের কান্না, ধর্ষিতার কান্না,
ভালবাসার ফাঁদে প্রতারিত হওয়ার অবিশ্বাস্য
বিস্ফোরিত কান্না।
ইট ভাঙা শ্রমিক মায়ের স্তনে বাদুড়ঝোলা শিশুর পেট না ভরা ক্ষুধার কান্না।
শুধু কান্নার ধ্বনি- প্রতিধ্বনি শুনতে শুনতে আমি ভুলে গেছি তোমাদের মুখরিত জয়ধ্বনি, আনন্দ জয়গান।

ক্ষমা করে দিও, আমি শিক্ষিত নই, আমি সভ্য সুশীল সমাজের কেউ নই। আমি জলের ধারায় চলি,
নিচের দিকে বয়ে যাই——।
আমি উচ্চবিত্ত নই, আমি মধ্যবিত্ত নই, আমি নিম্নবিত্তও নই——-
আমি ছন্নছাড়া উদ্বাস্ত————
——————————