গাঁয়ের ইতিকথা : মহব্বত আলী মন্টু

গাঁয়ের ইতিকথা
মহব্বত আলী মন্টু

জন্মেছি যে গ্রামে আমি
জন্মভুমি গ্রাম আমার গর্ব,
মিলে মিশে বেড়ে উঠেছি
জ্ঞাতি ভুলে,ভুলে জাতি ধর্ম।

সত্তর থেকে আশির দশক
হয়তো তার-ও আগে,
কৃষকের মাঝে পাল্লা থাকিত
ভোরে কে আগে জাগে।

দলবেঁধে কৃষক সকালে যাইতো
লাঙ্গল জোঁয়াল কাঁধে,
আলাদা জমি চাষ করিতো
কখনও গাঁতায় একসাথে।

জমি চষিতে বাড়িতো বেলা
সূর্য হইতো খাড়া,
ক্লান্ত হয়ে বলদ দুটিকে
বলিতো একটু দাঁড়া।

বসিতো গিয়া বিশ্রাম নিতে
বাঁবলা গাছের ছায়ায়,
এক এক করে চাষারা আসিত
‌‌‌‌‌ একে অন্যের মায়ায়।

বলিতো হুক্কায় তামাক সাধো
দু-টান দিয়া‌ যায়,
চষিতে হবে অনেক জমি
বসার সময় নাই।

তাদের মধ্যে বিদ্যা ছিলনা
ইচ্ছা‌ ছিলনা দিতে ফাঁকি,
সবার জমি চাষ করা শেষে
যদি কাহারো থাকিত বাকি।

সকলে আসিয়া একসাথে মিলে
বাকি জমি করিতো চাষ,
মিলেমিশে তারা একে অপরের
বিপদ দেখিয়া করিত‌ বাস।

অগ্রহায়ন পৌষ ভাদ্র মাসে
পাকিতো মাঠের ধান,
কাটিয়া আনিয়া খামারে রাখিত
গোবরে লেপিতো উঠান।

গোল করিয়া‌ ধানের পালা
উঁচু করিয়া সারি সারি,
ধান মাড়াতো সারাটি বেলা
গরুর পিছনে ঘুরি।

মলনে ঘুরিয়া গরুর পিছনে
বাড়ির কোন ছোট খোকা,
নাজেহাল হয়ে দুষ্টু ছেলে
পালইতো দিয়ে ধোকা।

আকাশে মেঘ খামারে ধান
বসিয়া থাকেনি কেহ ঘরে,
তড়িঘড়ি যে যেমন পারে
উঠায়েছে ধামা‌ ভরে।

মাড়ানোর পর সিদ্ধ করে
নাড়িতো উঠানের উপার,
শুকায়ে ভাঁজিতো খৈ চিড়া মুড়ি
মনে হতো নবান্ন এসেছে এবার।

চৈত্র মাসে ফসল শুন্য
‌ মাঠ খানি ধুধু ফাঁকা,
গরুর গাড়িতে গোবর লয়ে
জমিতে যাইতো চাষা।

ফেরার পথে খালি গাড়ি লয়ে
দৌড়াতো দুটি‌ গরু,
গ্রামের মাঠে আকাঁ বাঁকা পথে
রাস্তা খানি ছিল সরু।

কোথাও যদি কখনও পাইতো
‌ চওড়া রাস্তা খানি,
পিছন থেকে পাশ কাটিয়া
আগে উঠিয়া যাইত বাড়ি।

দৌড়ের চোটে গাড়ীর পিছনের
খুলিয়া যাইতো বাঁশ,
তবুও সবার আগে যেতে হবে
‌‌ ‌ মনে থাকিতো আশ।

কখনও আবার দুর্বল চাষী
পাশের চাচার ধরিয়া হাত,
কহিত বেগারে সার ফেলে দাও
খেতে দেব ডাল ভাত।

মনর হরষে সকলে মিলিয়া
সারি সারি গরুর গাড়ি,
অন্যের উপকার করিয়া দিতে
কাহারও ছিলনা আঁড়ি।

ঐ পাড়ায়‌ ছলিমের হালের‌ বলদ
মরিয়া গিয়াছে কাল,
অসহায় বেচারা সামনে বৈশাখ
‌‌‌‌‌ কি করে চষিবে হাল।

কলিম শুনিয়া এ পাড়ায়
যাহারা করিতো বাস,
কহিল সকলে‌ কালকে করিব
ছলিমের জমি চাষ।

রাত্রি বেলা বেগার খাইতো
বিছাইয়া কলার পাতা,
ডাল কাটিতে চাহিয়া আনিতো
নারকেলের মালার হাতা।

হাতায় করিয়া ডাল কাটিয়া
দিত যখন পাতার পরে,
সিমানা পেরনো ডাল ঠেকাতে
প্রতিরোধ করিত‌ করে।

চলবে—

“গাঁয়ের ইতিকথা”
মহব্বত আলী মন্টু পর্ব(২)

অগ্রহায়ন মাসে পড়িয়া যাইতো
খেজুর গাছ কাটার ধুম,
কে আগে বানাবে নলেন পাটালী
পাল্লায় ছিলনা চোখে ঘুম।

বাড়ির বধুরা পানিতে ধুঁয়ে
পোড়াইয়া রাখিতো ঠিলে,
বিকাল বেলা গাছ কাটিতে
ছিলনা তারা ঢিলে।

পৌষ মাসে কুয়াশা ভরা শীতে
ভোরে যাইতো বাক হাতে,
গাছ থেকে পাড়িয়া খেজুর রস
ছুটিতো বাড়ির পথে।

বাড়িতে আসিয়া টকটকে রস
বাছিয়া রাখিতো খাবে বলে,
রসের মজা আরো ভাল পেতে
মুড়ি দিয়েছে তাতে ঢেলে।

বাকিটুকু রস ঢালিয়া দিয়াছে
‌ চুলার উপর তাপালে,
জ্বালানোর পর রসের মলা
কাটিয়া ফেলেছে ভাগাড়ে।

ফোট আসিঅগ্রহায়ন রস
যখন গুড়ের কাছাকাছি,
বাড়ির ছোট বাচ্চারা সবে
নহরষে করেছে নাচানাচি।

চুলার উপর গরম তাপালে
বাড়ির মুরব্বি বুড়ি,
গরম গরম মোয়া খাবে বলে
ঢালিয়া দিয়াছে মুড়ি।

গুটি বসন্ত,কালাজ্বর,কলেরা
মহামারী ছিল ঘরে ঘরে,
তাইতো অনেকে এসব রোগে
‌ অকালে গিয়েছে ঝরে।

উত্তর পাড়ার জয়নাল মরেছে
বউ মরেছে দুদিন পরে,
বৈদ্য কবিরাজ হার‌ মেনেছে
দেখার ছিলনা কেউ ঘরে।

সালাম মোল্যা মকছেদ বিশ্বাস
মরেছে কলেরায়,
মরেছে রফিক গোলাম রসুল (নছো)
হরিজন রাজ কুমার।

রিয়াজউদ্দীন মোল্যা ঘুমিয়ে আছে
ভোর রাত্রি‌ বেলা,
আক্রান্ত হলো কলেরা রোগে
‌ রোহিলো একেলা।

খবর পাইয়া প্রথম আসিলো
দবির মোল্যা ধেঁয়ে,
আরো আসিলো মোশারফ মোল্যা
শামসুল আলমকে নিয়ে।

বৈদ্য কবিরাজ ডাকিয়া আনিলো
আবেদ আর‌ রোস্তম কে,
দাওয়াই দিয়া সেবার তারে
সারিয়া তুলিল আল্লার রহমতে।

গুটি বসন্ত আসিয়া তখন
ধরেছে বহু বাড়ি,
ভয়ে অনেকে পালিয়ে গিয়েছে
নিজের গ্রামটি ছাড়ি।

আছিয়া কে ধরিল গুটি বসন্তে
কহিল যদি আল্লাহ বাঁচায়,
গোলাম রসুল কে রাখিয়া দিলো
উঠানে কলার পাতায়।

মৃত্যুর দ্বারে দু জনের তরে
বিধাতা হইল সদয়,
নাম নাজানা অনেকে মরিলো
ওদের বাঁচায়ে‌ রাখিলো খোঁদায়।

দাওয়াই দিয়েছে আবেদ ফকির
গ্রাম দিয়েছে বন্ধ,
রোস্তম ডাক্তারের কবিরাজি বটি
সেও ছিলনা মন্দ।

ভেষস চিকিৎসাই রোস্তম ডাক্তার
‌‌ ‌ অনেক ছিল জ্ঞানি,
গাছ গাছড়ার দাওয়াই দিয়ে
করেছে সেবা জানি।

প্রতিরোধের জন্য আবেদ ফকির
প্রতি বছর একবার,
অগ্রহায়ন মাসে সকলে মিলে
গাঁয়ে বসায়েছে দরবার।

ছিন্নি দিতে চাল গুড় নিয়ে
বাড়িতে দিয়েছে তার,
জিকির শেষে রাত্রি বেলা
হাক দিয়েছে গ্রামভর।

চলবে- –