ছোট ভাইয়ের মৃত্যুতে বড় ভাইয়ের হৃদয় বিদারক ফেসবুক স্ট্যাটাস

সোহেল রানা সালমান ও তার বড় ভাই মো: কামাল হোসেন। ছবি ফেসবুক থেকে নেয়া। টাইম ভিশন ২৪

টাইম ভিশন ২৪: বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার বলইকাঠি গ্রামের মো: হাফেজ হাওলাদারের ছেলে তরতাজা যুবক সোহেল রানা সালমান। গত ৩রা জুলাই রোজ শুক্রবার ২০২০ ঝালকাঠির নেছারাবাদে পবিত্র জুময়ার নামাজ আদায় করতে যাওয়ার পথিমধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিক মৃত্যুবরন করেন । সোহেল রানা সালমানের মৃত্যুর ঘটনা ও স্মৃতিচারণ করে হৃদয় বিদারক ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন বড় ভাই মো: কামাল হোসেন । ফেসবুক স্ট্যাটাসটি প্রিয় পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো :

হৃদয়ের রক্তক্ষরণ চোখের জল দিয়ে মোছা – মোঃ কামাল হোসেন
বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
আজ শুক্রবার,৭ আগস্ট,২০২০ সাল। এই আগস্ট মাসে আমার জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক সুখের স্মৃতি আছে। আমার জন্মদিন ১২ আগস্ট, আমার বিবাহ বার্ষিকী ২৯ আগস্ট, আমার বড় মেয়ের জন্মদিন ৬ আগস্ট। এতগুলো সুখের ইভেন্ট থাকা সত্বেও আমি কেন যে জুলাইতে পড়ে আছি নিজেও জানিনা। এটা ঠিক যে, আমার একমাত্র ছেলে নিশাম হাওলাদারের জন্মদিন ১৪ জুলাই। দিনটি নিঃসন্দেহে আমি এবংআমার পরিবারের সকলের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। কিন্তু আমি ও আমার মন কেবলমাত্র ৩ জুলাইতেই আটকে আছে। ৩জুলাই থেকে আজকের ৭ আগস্ট এই মুহূর্ত পর্যন্ত মোট ১ মাস ৪দিন ১০ ঘন্টা১৫ মিনিট অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু সেদিনের সে ঘটনা এক সেকেন্ডের জন্য ভুলতে পারিনি,ভুলতে চাইও না। আপনারা কি শুনবেন সেদিনের ঘটনা? অতটা সময় কি হবে আপনাদের? হয়তো কারও হবে, কারও হবে না। তবু আমাকে যে লিখতেই হবে। ভাইয়ের কাছে আমি যে অনেক ঋনী। ৩ রা জুলাইকে বুঝতে হলে তার আগের কিছু কথা শুনতেই হবে নয়তো ৩ রা জুলাইকে বুঝা যাবে না। আমার পরিবারে আমার মা-বাবা রয়েছেন। তাদের কোল জুড়ে আমরা ৪ ভাই ও ৩ বোন। এই ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে ৭ম ( লাকি সেভেন) হল আমাদের সবার প্রিয় ছোট ভাই,” সোহেল রানা সালমান”। সে শুধু আমার পরিবারের সকলের ছোট তাই- ই নয়, আমাদের বংশের অর্থাৎ ৩ বাবা-চাচার ছেলেমেয়েদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ এবং একমাত্র অবিবাহিত সন্তান। সুতরাং তাকে নিয়ে কতটা স্বপ্ন, কতটা আশা-আকাঙ্ক্ষা তা বিশদভাবে ব্যাক্ষ্যা করার প্রয়োজন আছে কি? এই তো কিছুদিন আগে আমরা আমাদের গ্রামের বাড়ির নুতন বিল্ডিং এ উঠেছি। বিল্ডিংয়ের গ্রাউন্ড ফ্লোরের ২ টি ইউনিটের কাজই সম্পন হয়েছে। ২য় তলা অনিস্পন্ন। কথাছিল, ছোট ভাই(সোহেল)এর সরকারী চাকুরী ও বিবাহের পরে সেজ ভাই(হাসান)ও তার মধ্যে লটারির মাধ্যমে ইউনিটদুটো বাবা তাদের মধ্যে বিভাজন করে দিবেন আর আমি আমার সুযোগমতো ২য় তলার কাজ সমাপ্ত করে সেখানে থাকব। তারপর যা হলো শোনার আগে জেনে নিন, কেমন ছিল আমার কলিজার টুকরা, নয়নের মনি, আদরের ধন-সোহেল।

জন্মঃ১৯৯৩ সাল। পুরোনামঃ সোহেল রানা সালমান। ডাকনামঃ সোহেল। উচ্চতাঃ৫ফুট৭ইঞ্চি। গায়ের রংঃ ফর্সা।
শিক্ষাগত যোগ্যতাঃবি.কম। কর্মক্ষত্রঃ মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভ পদে সোমাটেক ফার্মাসিউটিক্যালসে কর্মরত ছিল। চারিত্রিক বর্ণনাঃ ছোটবেলা থেকেই নামাজ, রোজা করত। তবে আল্লাহর পরেই তার কাছে মা- বাবা ছিল শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কখনো মা-বাবার অবাধ্য হননি, তাদের মনে বিন্দুৃাত্র কষ্ট দেননি। অথচ এই তো গত শবেবরাতেও মা-বাবার পা ছুয়ে অঝোরে কেঁদেছে। কোন খাবার নিলে আমি/ আমরা মাকে খেয়ে নিতে বলতাম, আর সোহেল নিজ হাতে খেয়ে দিত। আমরা মাকে বলি- আপনি, ও বলতো তুমি। মা আজও কাঁদেন আর বলেন, বাবায় আমার পা কোলে নিয়ে পায়ের নখ কেটে দিত, এখন কে কেটে দিবে? অত্যন্ত সদালাপী ও মিষ্টভাষী এই ভাই আমার ছোটদেরকে যেমনি ভালোবাসত,স্নেহ করত তমনি গুরুজন বয়োজ্যেষ্ঠদের অত্যন্ত বিনয়ের সাথে শ্রদ্ধাভক্তি করত। ভাইবোনের আদেশ- নিষেধ যে এত সূক্ষাতিসূক্ষভাবে পালন করা যায় তা আমি তাকে ছাড়া দ্বিতীয় কাউকে দেখিনি। বড় পরোপকারী ছিল ভাই আমার। ওকে চিনতে না পারলেও ও নিজ থেকে নিজের পরিচয় দিয়ে মানুষের উপকারে ঝাপিয়ে পড়তো। পাশের গ্রামের সাইদুল মেম্বর (সাইদুল ভাই), ওর বস, জাহিদ ভাই এবং এছাড়াও নাম না জানা অনেকের মন্তব্য থেকে এর সত্যতা পাই।ওর আচার – ব্যবহারে মানুষ যে কতটা সন্তুষ্ট ছিল তা বুঝতে পারি ওর পাওনা টাকা আনতে দু/ একটা দোকানে গিয়ে। ওর কথা বলতো আর শুধু কাঁদত। মনে হত, তারা ও বুঝি আমারই মত ওর আপন ভাই।
যাহোক, ওর সম্পর্কে আরো অধিক বলার আগে একটু ৩রা জুলাইতে ফিরি নয়তে সেদিনের সে ঘটনা হয়তো আপনাদের জানাই হবে না। দেখি, চোখের জল দিয়ে সে দিনের সে ঘটনা কতটা তুলে ধরতে পারি।
“অশ্রুর বানে আমার এ লেখা যদি নাহি পারি সমাপ্ত করিবার, তবে অগ্রভাগেই সকলের কাছে সবিনয় ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি বারংবার।”

শুক্রবার, ৩রা জুলাই/২০২০ তখন সকাল সাড়ে দশটা বাজে। ” ভাইসাব, আসকের বাড়ী যাবেন?” (সোহেল আমাকে ভাইসাব ডাকত)
” হ্যা” “কখন যাইবেন?” কেন? “মায়ের ওষুধ দিমু। ” আমি তোরে ফোন দিয়া জানামু আনে। “আচ্ছা”। ওকে যখন আমি ফোন দেই তখন ১২ টা ৩৫/৪০মিঃ হবে। আমি ৪ তলা থেকে নিচে নেমে দেখি ভাই আমার উপস্থিত।

(এখান কিছু কথা না বললেই নয়। ভাই আমার ভাইসাব বলতে অজ্ঞান। ভাইসাবে এটা বলেছে, এটা যে কোন মূল্যে তার পালন করতেই হবে। ভাইসাব মানে তার কাছে ভয়, আতংক। তাইতো ভাই সাহস করে বলতে পারেনি, ভাইসাব, আমি নামাজ পড়তে নেছারাবাদ যাব , আপনি কখন না কখন যান, আমি আগেই ওষুধটা দিয়ে যাই।)

অন্যান্য দিন আমি ড্রাইভ করি, আজকের তা না করে আমি ওর পেছনে বসলাম। আমার সাথে ৮ কেজি আম ছিল। ব্যাগটা ওর আর আমার মাঝে রাখলাম। ওর পরনে ছিল সাদা ওপর হাল্কা ছাপার পাঞ্জাবী, সাদা পায়জামা এবং চোখে সানগ্লাস। ও মোটর সাইকেল চালানো অবস্থায় সদর গার্লস স্কুলের একটু পূর্বপার্শে (বি টু ওয়ান সফের আগে) গিয়ে আমার দিকে ৩০ ডিগ্রি এ্যাংগেলে তাকিয়ে বলতেছিল-
“ভাইসাব, আজকের নেছারাদ মসজিদে নামাজ পড়তে যাব”
মোবাইলে তাকিয়ে দেখি পৌনে একটা বাজে। ওকে বললাম, এখন গিয়া জামাত পাবি? টার্গেট নিয়ে গেলে অনেক সময় দূর্ঘটনা ঘটে। ” ঐ জায়গায় ২ টা জামাত হয়। দ্বিতীয় জামাত ধরব।”

কথা বলতে বলতে চরকাউয়া খেয়াঘাট চলে আসলাম। নিমিষেই গাড়ী থেকে নেমে পড়লাম। ওকে বললাম”যা।”
(ওর যাতে ১ মিনিট সময় ও নষ্ট না হয় সে জন্যই তড়িঘড়ি করে নেমে ওকে যেতে বলেছিলাম। কিন্তু এই যা বলাটাই যে…… বুঝতে পারিনি। ও প্রায় সব শুক্রবারই বাড়ী যেত, হয় আমার সাথে অথবা একা। ঐ দিন নেছারাবাদ গিয়ে নামাজ পড়ার কথা বলার কারনে বাড়ী যাওয়ার কথা বলিনি। আমি মুখ থেকে একবার বললে ভাই আমার সবকিছু ফেলে আমার সাথে বাড়ী যেত। হায় আল্লাহ, কেন যে সেদিন বলিনি!)
আমি ট্রলারে নদী পার হয়ে একটি ভাড়া হোন্ডায় বাড়ী পৌঁছালাম।
মা-বাবার সাথে সালাম বিনিময়ের পরে বড় ভাইয়ের সাথে দেখা করতে তার রুমে গেলাম। বড় ভাই প্রায় ১ বছর পরে ঐ দিন সকালেই ঢাকা থেকে এসেছেন।আমার সোনামনি, সোহেল, বরাবরের মত তাদেরকে( ভাবী, ভাইঝি, রুপাসহ) তাদেরকে কেবিন থেকে রিসিভ করে বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্ত বড় ভাই সেফটির কথা ভেবে ওকে আসতে বাড়ন করেছিলেন। উল্লেখ্য, বড় ভাই করোন আক্রান্ত না হয়েও বাড়তি সচেতনতার জন্য এট করেছিলেন।)
কেবল মাত্র জুতা খুলে বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে ক্ষেতে বসব, এ সময় মায়ের প্রশ্নঃ বাবা, সোহেল ওষুধ দেয়নি?
” মা, দিয়েছিল। ও নেছারাবাদ নামাজ পড়তে যাবে তাই তাড়াহুড়া করে চলে এসেছি, আর ওর ও মনে নেই। ও কারো কাছে পাঠিয়ে দিবে আনে” এরপর সোহেলকে ২ বার ফোন দিলাম। কোন ও জবাব নেই। হঠাৎ আননোন নাম্বার থেকে ওর বন্ধু, হাসানের ফোন, সোহেল এ্যাকসিডেন্ট করেছে, শেরেবাংলা হসপিটালে আসেন। এরপর আর পারছিনা। মাফ করবেন। এক পর্যায়ে সংবাদ এলো, ভাই আমার……… ( ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন)
ভাই আমার আর এক/ দেড় কিলোমিটার এগোতে পারলেই নেছারাবাদ মসজিদে পৌঁছে যেত এবং দয়াময় আল্লাহকে বড় সাধের সিজদা দিতে পারতো। হে রহমান, হে রহীম, হে পরম করুনাময় আল্লাহ, আপনি তার এ নেক ইচ্ছাকে কবুল ও মঞ্জুর করুন। হে মহান রাব্বুল আল-আমিন, আপনি তার এ মৃত্যুকে শহীদি মৃত্যু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাকে জান্নাতী হিসেবে কবুল ও মঞ্জুর করে নিন। আমিন।
যারা আমার মৃত ভাই সোহেলকে ভালোবাসতেন কিংবা আমাকে ভালোবাসন, তারা যদি এ লেখা পড়ার পরে অন্ততঃ১ বার সূরা ফাতিহা, ৩ বার সূরা ইখলাস এবং১ বার দরূদ শরীফ পড়ে আমার কলিজার টুকরা, নয়নের মনি, আদরের ধন, সোনাভাইয়া, সোহেলের জন্য দোয়া করেন, তবেই আমার এ লেখা সার্থক হবে এবং তাদের সকলের নিকট আমি চির কৃতজ্ঞ থাকব।

অনুলিখন: ওবায়দুল ইসলাম অভি, চেয়ারম্যান টাইম ভিশন । নির্বাহী সম্পাদক ৭১ নিউজ২৪ । স্টাফ রিপোর্টার দৈনিক যশোর।