বাংলার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির একটি ছুটি খাঁ মসজিদ

বাংলার ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলির একটি ছুটি খাঁ মসজিদ। টাইম ভিশন ২৪

মো: মজিবুলহক, জোরারগঞ্জ (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: এইটি শাহী আমল তথা ইরানি মুসলিম শাসনামলের নিদর্শনসমূহের অন্যতম নিদর্শন এই মসজিদ। যতদূর জানা যায়, গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহের আমলে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন লস্কর পরাগল খাঁ তারপরে শাসনকর্তা হন তাঁর পুত্র ছুটি খাঁ। পরাগল খাঁর পিতা রুকনুদ্দীন বারবাক শাহের আমলে চট্টগ্রামের শাসনকর্তা ছিলেন। পরাগল খাঁ আর ছুটি খাঁর শাসনামলে চট্টগ্রামের শাসনকেন্দ্র ছিল পরাগলপুর। নাম শুনেই বোঝা যায় শাসনকর্তার নামানুসারেই পরাগলপুরের নামকরণ করা হয়েছে। প্রাচীন রাজারা প্রজাদরদী ছিলেন। নিজেদের সুনাম ও প্রভাব অক্ষুণ্ন রাখতে তারা বহু জনকল্যাণমূলক কাজ করতেন। এলাকার পানীয় জলের অভাব মেটাতে তারা বিশালাকার দীঘি খনন করতেন। মুসলিমদের জন্য সুদৃশ্য মসজিদ আর হিন্দুদের জন্য নয়নাভিরাম মন্দির নির্মাণ করতেন তারা। ছুটি খাঁ-ও এর ব্যতিক্রম ছিলেননা। তাঁর শাসনামলে জোরারগঞ্জ সহ আশেপাশের বেশ কিছু অঞ্চলে দীঘি খনন ও মসজিদ নির্মাণ করা হয়। জোরারগঞ্জ ইউনিয়নের দেওয়ানপুর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত ছুটি খাঁ মসজিদটি তারই সুশাসনের এক ঐতিহাসিক নিদর্শন।

মসজিদের পার্শ্ববর্তী দীঘিটি নিয়েও রয়েছে মজার ইতিহাস। এটা আবার অনেক এলাকায় প্রচলিত জনশ্রুতির মতোই। ধারণা করা হতোঃ একদল জ্বীন এই দীঘির নিচে বাস করতো। তারা ছিল অগাধ সম্পদের মালিক। এদেরকে অনেক এলাকাতে বলে যক্ষ। শোনা যায়ঃ মসজিদের পাশের এই দীঘিতে এলাকার কোনো অনুষ্ঠানের যেমন- বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানাদি এলে দীঘির পাড়ে মাটি দিয়ে লেপে প্রয়োজনীয় থালা বাসনের সংখ্যা লিখে প্রার্থনা করলে পরের দিন সকালে তা নৌকাসহ ভাসতে দেখা যেত। প্রয়োজন শেষ হয়ে যাওয়ার পর আবার নৌকাতে রেখে দিলে তা ডুবে যেত। কিন্তু কেউ যদি একটা থালা বাসন কম দিত তাহলে নৌকা ডুবতো না পাশাপাশি তার ক্ষতি হতো বলে জনশ্রুতি রয়েছে। পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু দিকে যেই সকল মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয় তাঁর অন্যতম একটি নিদর্শন ছুটি খাঁ মসজিদ। মূল মসজিদটি অনেক আগেই ভেঙে পড়েছে। পরবর্তীতে নতুনভাবে মসজিদ ভবনটি নির্মাণ করা হয়। মূল মসজিদের বেশ কিছু ছোট বড় পাথর শিলালিপি সেখানে দেখতে পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্বিক বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহের কিছু সংরক্ষণ করেছে। মূল মসজিদ তৈরিতে ব্যবহৃত পাথরগুলো ভারতের রাজস্থান ও অন্যান্য রাজ্য থেকে আনা হয়েছে বলে জানা য়ায়। কালো রঙের নানা ডিজাইন ও আকৃতির কিছু পাথর এখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মসজিদের আঙিনায়। মসজিদের ভেতরে একাধিক শিলালিপির একটিতে সুন্দর লিখনচিত্র (ক্যালিওগ্রাফি) পবিত্র কোরআন শরীফ থেকে আয়াতুল কুরশী লিখিত আছে।

চট্টগ্রামের ইতিহাস নিয়ে লিখিত বিভিন্ন বইয়ে ছুটি খাঁ মসজিদের কথা উল্লেখ রয়েছে। এসব বইয়ে লেখা আছে ছুটি খাঁ মসজিদ খোদিত পাথরের ব্লক দিয়ে নির্মিত ছিল। পাথরের সবগুলোতেই ছিল তোগরা হরফে আল-কোরআনের নানা আয়াত ও আরবী দোয়া। তবে মসজিদটির নির্মাতা পরাগল খাঁ, না ছুটি খাঁ এ বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে ১৫১৫ খ্রি. এর পরবর্তী সময়ে এ মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ আছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে কখনো ঐতিহাসিক মসজিদটির নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রাচীন নিদর্শনগুলোর অনেকগুলো এখনো অযত্নে পড়ে আছে।

ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন নিদর্শনগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস এবং একই সাথে তৎকালীন সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারবে। যদিওবা এ মসজিদটি পঞ্চদশ শতাব্দীর নিদর্শন হিসেবে টিকে আছে। সেই সাথে স্মরণ করিয়ে দেয় তৎকালিন সময়ের ত্রিপুরা ও আরাকানি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিক ছুটি খাঁ’র স্মৃতিকথা-ও। এই ধরণের ঐতিহাসিক স্মৃতিগুলো রক্ষায়/যত্নে স্থানীয়রা প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি কামনা করেন। দর্শনার্থীরা যেভাবে আসবেনঃ ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার বারৈয়ার হাট নামক বাজারে নেমে ১৫/টাকা সিএনজি ভাড়া নিবে, জোরারগঞ্জ বাজারের ২০০গজ আগে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি এবং চট্টগ্রাম থেকে আসতে মাদারবাড়ি শুভপুর বাসস্ট্যান্ড হতে চয়েস গাড়িযোগে ৮০টাকা (বর্তমানে সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখার স্বার্থে দুই সিট মিলে একজন যাত্রী হিসেবে ভাড়া দ্বিগুণ) ভাড়ায় জোরারগঞ্জ বা বারৈয়ার হাট নামবেন।