বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনই সফলতা : সোহাগী খাতুন

বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনই সফলতা
সোহাগী খাতুন

খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সফলতার গল্প শুনতে ভালোই লাগে।
মনে হয়- ঐ জায়গায় যদি আমি হতাম!

কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্য, পরিস্থিতি মোকাবেলা করা বড়োই কঠিন! মানুষ শখ করে কখনো খারাপ হয়না।আত্মহত্যার পথ ও কেউ বিনা কারণে বেছে নেয় না। সময় খারাপ হলে মায়ার বন্ধন ও ছেড়ে পালাতে হয়।আর যারা পরিস্থিতির সাথে লড়াই করে সফল হয় তারা মানুষ নয়,পাগল। প্রবল স্রোতের টানে মানুষ কূলহারা হলে কিছুক্ষণের জন্য চেষ্টা করে বেঁচে থাকার। কিন্তু মানুষ হিসেবে খারাপ সময় পার করতে হয় অনেক ক্ষুরধার স্রোতের মুখোমুখি হয়ে। কখনো দূষিত পানি খেয়ে,কখনো পানির নিচে অসাড় হয়ে কখনো মৃত মানুষের মতো বাকহীন হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। ব্যর্থ মানুষের জীবনটা অন্ধ সমাজের চোটে বিষাক্ত হয়। হয় দিশেহারা, ঘরছাড়া।

আর সবাই’ই কোনো না কোনো পরিস্থিতির মধ্যেই জীবন কাটায়।
যে পরিবারে কায়ক্লেশে দিন যায়, সেই পরিবারের কর্তা যদি হঠাৎ মারা যায়? অথবা কর্তা ও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি যদি সংসার সম্পর্কে দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়? আর কর্মহীনা মা’কে দু’বেলা চোখের জল ফেলে যদি সবার খাবারের চিন্তা করতে হয়? দেখেছে কেউ কর্মব্যস্ততা ছাড়াই একটা দিন না খেয়ে থাকার জ্বালা কেমন? যে খারাপ পরিস্থিতি থেকে সফলতার চাবিকাঠি হাতে পাই, সেও এমনি ভাবে কত রাত কত দিন না খেয়ে কাটিয়েছে! পরনের কাপড় ও কত জনের কাছে চেয়ে নিয়েছে! পেটের ক্ষুধায় ঘুমাতে পারেনি কত রাত! যখন কোনো রকমে দিন চালানোর সামর্থ্য হয় তখনও খরচ অনেক চেপে চালাতে হয়। একান্ত প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া সেই মানুষটি একটি পয়সাও ব্যয় করে না। বিলাসিতা তার জন্য কঠোর শাস্তি। অথচ যে সফল হয় তার ইতিহাস শুনলে কতোইনা স্বাভাবিক মনে হয়?অন্যের মত ব্যর্থতা খুঁজে কি লাভ? আফসোস’ই হবে -আমাকে যদি কেউ এমন আঘাত করতো! তাহলে আমি আজ এমন থাকতাম না!যার আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা আছে চেয়ে দেখ ব্যর্থতা নিজের চারপাশেই ছড়াছড়ি।

একজন পরীক্ষায় ফেল করলে তার দিকে লোকসমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, তার অতীত গবেষণা,ভবিষ্যৎ বর্ণণা, আর ফেল করার খোঁচায় জীবনটা বিষিয়ে তোলে।ফেল করার পর নিজেরই এই অপাচ্য বিষ শরীরের প্রতিটা লোম,কোষ,লোহুকে চব্বিশ ঘণ্টা কাটার মত আঘাত করে বিষিয়ে তোলে মনকে। কী করল সে? যদি বেশি খেলা না খেলে একটু পড়তো? যদি এমন অবস্থার কথা আগেই জানতে পারতো? তবে সে হয়তো ফেল করতো না। কত পিছিয়ে গেল বন্ধুদের থেকে!সে ভেবেছিল- বইয়ের পড়া সব সে পারে।পরীক্ষায় ও পাশ করে যাবে।সত্যতা সে ফলাফলের পরেই উপলব্ধি করে।

ঠিক তেমনি ভালো ফলাফল করেও অর্থাভাবে নতুন ক্লাসে ভর্তি হতে না পারলে অনুতপ্ত হৃদয়ের অন্তক্ষরণ প্রিয় বিয়োগের থেকেও মারাত্মক হয়। প্রিয় বিয়োগের বেদনায় মানুষ যতটা না ভেঙে পড়ে,যোগ্যতা থেকেও যোগ্য স্থানে না যেতে পেরে মানুষ তার থেকেও হাজারগুণ ভেঙে পড়ে। নতুন শ্রেণীতে পরবর্তী বছর ভর্তি হলেও বারবার মন বলে- এই পড়াগুলো এক বছর আগেই হয়ে যেত! সহপাঠীরা একটা ক্লাস এগিয়ে গেল! আর গ্যাপ দেওয়ার কারণ বলতে বলতে তার অনুতপ্ত হৃদয়ের হাহাকার আরও বেড়ে যায়। এক সময় সে নিজেই বুঝতে পারে একটা বছর মিস করায় তার কতটা ক্ষতি হয়েছে! ভুলে গেছে পঠিত অনেক কিছু! এমন কী মানসিক সমস্যা হতেও দেরি হয় না। তবে এই অবস্থার পর ও নিজের অবস্থান গড়তে যে শক্ত হয়ে দাঁড়ায় সেই সফল হয়।

যে ব্যর্থ হয়, তাকে আঘাত করার জন্য অনেকেই বিনা দাওয়াতে পথে- ঘাটে-মাঠে-হাটে হাজির হয়। লজ্জাূ আর অপমানের বিষ হজম করতে হয়-অশ্রু লুকাতে আকাশের দিকে চেয়ে,বারবার চোখের পলক ফেলে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর গোপনে নিঃশব্দে কেঁদে কেঁদে।

এই যে বিনা দাওয়াতের অতিথিগুলো,ব্যর্থ হওয়ার আগে ভালো ভালো উপদেশ মূলক গল্প শোনাতে কি পয়সা লাগে? না-কি অন্যকে আঘাত করে কিছু কামায় হয়?শুনে রাখ- ব্যর্থ হওয়ার পরেও উপদেশ দেওয়া যায়- চেষ্টা করো,পারবে।

একটা অদক্ষ ছেলে কাজ শিখতে গেলে কতই না বকুনি শুনতে হয়! থাপ্পড় ও খেতে হয় অনেকের হাতে!!মা-মাতাল তুলে গালিও শুনতে হয়। ঐ সময় ঐ ছেলের মনের অবস্থা হয় সেখান থেকে পালিয়ে যাবে। পালিয়ে আর যাবে কোথায়? যেখানেই যাক কারো না কারো সাহায্য নিতেই হবে। আর কাজ না করলে গর্ভধারিণী ও ভালোবাসে না।

জীবনে যত অত্যাচার সহ্য করে, নিজে খাঁটি হয়ে, সৎ পথে উপার্জন করলেই পরম করুণাময়ের দয়ার হদিস পাওয়া যায়। ভাত এমনিতেই পেটে পড়ে না, পেট পর্যন্ত পৌছাতে চালের ব্যবস্থা করে রান্নার কাজ সারতে হয়, ভাত শুধু শুধুই গলার নিচে নামে না, সে ব্যবস্থা ও করতে হয়। তাই সফলতার জন্য ব্যর্থতা খুঁজলেই চলবে না। এমন মনোভাব থাকতে হবে – খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ঐ ব্যক্তি যদি সফল হয় আমি হব না কেন? আমার ও চলার পথে ব্যর্থতা আসতে পারে। চাষাবাদে ক্ষয়ক্ষতি হয়ে চার পাঁচ বছরে নিঃস্ব হয়ে সকল আশা হারিয়েও কোনো এক বছরের একটি ফসলেই আবার স্বপ্ন দেখাতে পারে। ব্যবসায় বারবার ব্যর্থতা আসতে পারে,চাকরীতে বেতন মেরে দিয়ে চাকরিও কেড়ে নিতে পারে, দেনার জ্বালায় দেশ ও ছাড়তে পারে, দূর্যোগ, মহামারীর ও স্বীকার হতে পারে, তবে আজ- কাল না খেতে পারলেও পরশু খাবারের জন্য গাছের পাতা না হয় জল জুটবেই।

সবচেয়ে বড় কথা-কোটিপতি সবাই হয় না, খারাপ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়ই সফলতা। সফলতাকে সম্পদের মাপকাঠিতে মাপা যায় না। যদিও দুঃসময় মানুষের জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নেয়, মানসিক,আর্থিক, কখনো কখনো শারীরিক যন্ত্রণা দেয়; তবে সেই দুঃসময়ই শিক্ষা দেয় মানুষের মত মানুষ হতে, পাশের মানুষগুলোকে চিনতে, অন্যের দুঃখ-কষ্ট বুঝতে। তাই বর্তমান অবস্থা পরিবর্তনের মধ্যেই সফলতা নিহীত।