আমাদের বাৎসরিক উৎসব ও ঈদুল আজহা : মাহমুদা রিনি

আমাদের বাৎসরিক উৎসব ও ঈদুল আজহা
মাহমুদা রিনি

পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা সবাইকে। সামাজিক ভাতৃত্ববোধ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ শুধু মুসলমানদের নয় সকল মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক। যদিও কোন উৎসব এক সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, কোন না কোন ভাবে এই বৃহত্তর আয়োজনের সাথে সম্পৃক্ত হয় সকল ধর্মের মানুষ। তাছাড়া সামাজিক সম্প্রীতির কারণেই এইদিন সকল ভেদাভেদ ভুলে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্যই গৃহের দ্বার থাকে উন্মুক্ত। পশু কোরবানির মধ্য দিয়েই মনে সব পশু প্রবৃত্তি নিধন করাই এই ঈদুল আজহা বা কোরবানি প্রধান লক্ষ্য। এটি সামর্থবান মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব ইবাদত।

ঈদ শুধু পরিবারিক আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে তা নয়। আমাদের দেশের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা কাঠামোর মধ্যেও ঈদ অনেকখানি সম্পৃক্ত। চাকুরীজীবিদের জন্য ঈদের ছুটি, ঈদ বোনাস। পরিবহন ব্যবস্থাপনায়ও ঈদের আগে পরে ব্যাপক তোড়জোড়। ঈদের ছুটিতে মানুষ বাড়ি ফিরবে আবার ঈদ শেষে কর্মস্থলে। এই আসা-যাওয়ার পুরো দায়িত্বই থাকে পরিবহন সেক্টরের উপর। এছাড়াও ঈদকে কেন্দ্র করে ছোট- বড়, ক্ষুদ্র, মাঝারি নানান রকমের ব্যবসা ও বিনিয়োগ আমাদের দেশে চলে আসছে বহু যুগ ধরে। ঈদুল আজহার সময় সেটা আরো ভিন্ন মাত্রা বয়ে আনে কোরবানির পশু বেচাকেনার হাট বা এর সাথে জড়িত সকল কারবার। এছাড়াও আছে চামড়ার বিশাল বাজার, যা আমাদ রপ্তানি আয়ের একটি বড় মাধ্যম।

ঈদ আনন্দের অপরিহার্য অংশ হচ্ছে ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরা। যারা চাকরি সুত্রে, ব্যবসা বা যে কোন কাজের কারণে সারাবছর দূরে থাকেন তারা এই ঈদের ক’টা দিনের ছুটিতে বাড়ি এসে পরিবারের সাথে সময় কাটাতে চান। রোজার শেষ দিনগুলোতে সাধ্যমত কেনাকাটা করে ঈদের ছুটির শুরুতে বাড়ির দিকে রওনা দেয়ার যে প্রাণান্তকর চেষ্টা থাকে মানুষের তা সত্যিই রীতিমতো বিস্ময়কর। বাড়িতে মা বাবা ভাই বোন সহ আত্মীয় পরিজনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার আনন্দ যেন পৃথিবীর সকল কষ্টের কাছেই তুচ্ছ।
এমনি চিরাচরিত ভাবে পালন হয়ে আসছে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ঈদ উৎসব। আমাদের দেখা প্রায় পঞ্চাশ বছরের ঈদ আয়োজনে হয়তো অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া, বিশ্বব্যাপি প্রযুক্তির ব্যবহারে ছোট হয়ে এসেছে পৃথিবী। চাহিদা বেড়েছে সামর্থ্য অনুযায়ী, হয়তোবা অনেক সময় সামর্থ্যের তুলনায়ও বেশি কিন্তু ঈদ ঘিরে আন্তরিকতা, আতিথেয়তা সেই এক বৃত্তেই রয়ে গেছে।

এবার নজর দিই ২০২০ সালের ঈদ আয়োজনের দিকে। এ বছরের ঈদ এই শতাব্দীর মধ্যে অন্যতম এক অভিজ্ঞতা এই সময়ের মানুষের জন্য। ২০১৯ এর শেষ দিক থেকেই পৃথিবী আক্রান্ত কোভিড ১৯ করোনা নামক এক ভাইরাসে। পৃথিবীর প্রায় সব গুলো দেশই এই মারণ ভাইরাসের কবলে ধরাশায়ী। বিশ্ব ব্যাপি বেড়ে চলেছে মৃত্যুর মিছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ এর শিকার হয়ে মৃত্যু বরণ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একে বিশ্ব মহামারী বলে চিহ্নিত করেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকতে পারেনি। মার্চের আট তারিখে বাংলাদেশেও এই করোনা ভাইরাস সশরীরে প্রবেশ করে। করোনা ভাইরাসএ আক্রান্ত রোগের কোন ওষুধ, টিকা আজো আবিষ্কার হয়নি। শারীরিক, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখাই যার একমাত্র উপায় এই ভাইরাস থেকে নিস্তার পাওয়ার।

আবারও ফিরে আসি ঈদ প্রসঙ্গে। আমরা ঈদের বাজার দেখি। ঈদ আনন্দে বাড়ি ফেরা দেখি। রাস্তা ঘাটে ফেরীতে, মসজিদে উপচে পড়া ভীড় দেখলাম। বড় বড় গোরু ছাগলের হাট দেখি শুধু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মৃতের জানাজায় লোক দেখি না। কোন আপনজন দেখি না। কয়েকজন পিপিই পরা মানুষ জানাজা পড়ে। কোনরকমে আলগোছে মাটি চাপা দেয়।
শেষ করি যারা ঈদে বাড়ি আসলেন তাদের অভিনন্দন জানিয়ে। নিজের গাড়িতে আসলেন, ভাড়া গাড়িতে আসলেন, ট্যাক্সি, ইজিবাইক, ভ্যান, রিকশা, ট্রাক, মাছের গাড়ি, তরকারির গাড়িতে করে আপনজনের সাথে ঈদ করার আনন্দে পাহাড় ভেঙে চলে আসার মত আসলেন। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন প্রিয়জনের জন্য উপহারের সাথে বা বাজারের সবচেয়ে বড় গোরু বা ছাগলের সাথে করোনা ভাইরাস এর জীবাণু বয়ে আনেননি? আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনার শরীরে জীবাণুর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা থাকলেও আপনার বাড়ির বয়স্ক সদস্যটির নাও থাকতে পারে। আপনার প্রতিবেশী আক্রান্ত হতে পারে। পুরো একটা এলাকার মানুষ সংক্রমিত হতে পারে শুধু আপনারই জন্য! একবার মনে হলো না পরিবারের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব আপনারও। সত্যি আমাদের কিছুই মনে থাকে না, সবকিছুই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়।
আমি কোরবানির বিপক্ষে বলছি না। কোরবানি ওয়াজিব ইবাদত তা আমাদের অবশ্যই পালন করতে হবে, কিন্তু মনে রাখতে হবে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার নিয়ম গুলো।

তারপরও ঈদ হোক সবার আনন্দের। হাসি ফুটে উঠুক সকলের মুখে। কোরবানি ঈদের ত্যাগের মহিমা যেন আমরা আত্মস্থ করতে পারি। অভিশপ্ত করোনা ভাইরাস হার মানুক আমাদের আত্মশক্তির কাছে। সব ভয় দূর করে নতুন আনন্দে বেঁচে উঠি সবাই। সেরে উঠুক পৃথিবী। পৃথিবী টা হোক আনন্দময়।