আহা মানুষ! : শাহনাজ পারভীন

আহা মানুষ!
শাহনাজ পারভীন

আহা মানুষ! সেই যে আদিম যুগ! মনে পড়ে?

মাত্র তো দুটি পাতা একটুখানি গাছের বাকল শরীরে জড়িয়ে নিয়ে
সারাদিন উদভ্রান্ত ঘুরে ঘুরে ব্যস্ত ছিলে
আহার ও বিহারে, বনে ও বাদাড়ে।
তারপর দিন শেষে
শিকারের মাংসে কিছুটা আগুনের ঝলকানি,
তাজা ফল, কাঁচা লতাপাতা, গুল্ম, কচুর কন্দ
তাতেই নিশ্চিন্তে হাসি আনন্দে চলে যেতো দিন!
ছিল না অভাব কোনোদিন!
আরামে আয়েশে গুহার ওয়ালে নানান চিত্র এঁকে
ঘুমাতে নির্বিবাদে।

তখন প্রকৃতিতে কোনো অত্যাচার ছিলো না,
ছিলো না সঞ্চয়, ছিলো না লোভ, লালসা, ক্ষমতার দাপট,
সিংহাসন, সিংহ দরজা, শহর, নগর, কলকারখানা, সমূহ ব্যসন।
না ছিল ফ্যাশান সর্বস্ব আধুনিকতা।

কালে কালে সক্রেটিসের শিক্ষাপাঠ গাছতলা থেকে উঠে এলো শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত ক্লাসরুমে
আদিম যুগের সিদ্ধ ঝলসানো শিকারির মাংস গেলো ঝলমলে রেস্টুরেন্টে
গাছের ছাল বাকল আজ জায়গা করেছে কর্পোরেট গার্মেন্টসে,
বাংলাদেশ ছাড়িয়ে আজ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার অর্ডার পায় বহির্বিশ্বে প্রতিনিয়ত

অথচ সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছে আজ মানুষ হলো অত্যাচারী, দাম্ভিক।
লোভ লালসায় জ্বরাজীর্ণ, অমানুষে পরিনত হলো আশরাফুল মাখলুকাত– সৃষ্টির সেরা জীব।
মূল্যবোধ হীন অবক্ষয়ী সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়লো অনৈতিকতা।
শুরু হলো প্রকৃতির উপরে নির্বিচারে অত্যাচারের মাত্রাতিরিক্ত বিভৎসতা।
মারণাস্ত্র তৈরীর ফর্মুলা, যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা, নির্বিচারে মানুষ হত্যা, ধর্মের নামে মিথ্যাচার, অধর্ম।
দুর্বলের উপরে সবলের সজোরে আঘাত,
অধিকার কেড়ে নেবার সংস্কৃতি।
‘জোর যার মুল্লুক তার’ এই বিভীষিকাময় প্রথার বিস্তার,
অবলীলায় প্রকৃতির ধ্বংস, প্রাকৃতিক বিপর্যয়।
মেহনতি মানুষের অধিকার কেড়ে নেবার অব্যর্থ প্রয়াস।

আহা মানুষ! তোমরা তো ভুলে গেছো
আপাত অথর্ব প্রকৃতিও প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর
সেও অদৃশ্য এক শত্রু পাঠিয়ে চুপচাপ বসে আছে ঠাঁই।
দেখছে তোমাদের খেয়াল, খেলার অভিশাপ!
সে অদৃশ্য জীবানুর মোকাবিলায় পৃথিবীর মানুষ আজ নাকাল, বিধ্বস্ত;
অর্থ, বিত্ত, বৈভব কোন কিছুই আর কাজে আসছে না আজ, সব অনর্থ, অকারণ।
এই ছোট্ট জীবাণুর আক্রমণে সমস্ত পৃথিবীর
মানুষ আজ ঘরের ভেতরে বন্দি
সমুদ্র, পাহাড়, আকাশ, নদী, বনাঞ্চলে তাদের অবাধ বিচরণ আজ রুদ্ধ
স্বেচ্ছাচারিতা ও জবর দখলের মহোৎসব থেকে নিজেদের বিরত রাখতে তারা আজ বাধ্য
মৃত্যু ভয় তাদের তাড়া করে ফিরছে শহর, নগর, ঘরের ভেতর।
আপাত বাইরে শান্ত, সেখানে না আছে অস্ত্র, যুদ্ধ, হিংস্রতা,
অথচ করোনা ভয় তাদেরকে শুনশান ঘরে বন্দি রেখেছে পায়রাবন্দ।
এমনকি নিজেরই ঘরে রাখা ফ্রিজটি খুলতেও তারা আতঙ্কিত আজ।
বাজার থেকে কিনে আনা রসদ, সবজি, মাছ সাঁতার কাটছে হুইল পাউডার আর ব্লিচিং পানিতে।
সাবান পানিতে বিশ সেকেণ্ড হাত ধুতে ধুতে মানুষ ক্লান্ত,
নিজের সুদৃশ্য হাত, কোমল কপোল ঢেকে ফেলছে মাস্কের কঠিন আবরণে,
প্রিয়জন থেকে দূরে থাকছে শত হাত।
নিজের প্রাণ প্রিয় সন্তান, মাতাপিতা, এমনকি
প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা আঙিনা, ছাদ, সিঁড়িঘর, সব আজ দৃষ্টির বাহিরে।
সেনিটাইজার, গ্লোব, মাস্ক এখন ঘরে ঘরে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য
কোয়ারান্টাইন, লকডাউন এর মতো নতুন বিদেশী শব্দগুলো মানুষের মুখের সাথে লেপ্টে গেছে সাবলীল

কোভিড নাইনটিনের ভ্যাকসিন আবিষ্কারে, চিকিৎসায়
বিশ্বসেরা হাসপাতাল, ল্যাবরেটরি দিনকে দিন ঘর্মাক্ত,
ক্রমাগত পরীক্ষা করছে ইঁদুর, বাদুড় এবং মানুষের ওপর
অথচ এত এত পিপিই, ডাক্তার ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে তোয়াক্কা না করে
বিশ্বে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে প্রতিদিন।

এইসব ঠিক ঠিক ইতিহাসে লেখা থাকবে একদিন
যেমন জেনেছি আমরা আদিম যুগের অন্ধকারের কথা, যেমন জেনেছি মধ্যযুগের বর্বরতার ইতিহাস,
সামন্ত যুগের ঝলকানি এবং আধুনিক পেরিয়ে উত্তরাধুনিক ডিজিটাল সময় এখন।

তেমনি পৃথিবীর পরবর্তী প্রজন্ম জেনে যাবে
কোভিড নাইনটিন সময়ের কথা
অত্যাচারে জর্জরিত পৃথিবীর এই কষ্টের কথা
আমরা বিদায় নিলেও আমাদের কর্ম থেকে যাবে
এই দুর্দিনেও আমরা দুর্নিবার দুর্নীতি করে যাচ্ছি
মানুষের হক নষ্ট করছি,
মানুষ কে কষ্ট দিচ্ছি কথায় এবং কাজে।
ইতিহাসের পাতায় আমরা হয়ত দুর্ভাগা বা দূর্নীতিবাজ অমানবিক কিম্বা অমানুষ হিসেবে থেকে যেতে পারি

আগামী প্রজন্ম হয় তো তখন এ থেকে শিক্ষা নেবে,
ভুলে যাবে বিগত দিনের অবিমিশ্র বেদনার কথা
যত্ন নেবে প্রকৃতি, এবং মানুষকে সাধ্যমত
এবং এভাবেই গড়ে উঠবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে ভরা আনকোরা নতুন এক ভূমি।