বুড়িভদ্রার বাঁকে : এম এ কাসেম অমিয়

বুড়িভদ্রার বাঁকে
এম এ কাসেম অমিয়

খরস্রোতা ভারি, ছোট নদী এক, বুড়িভদ্রা নামে।
আলতাপোলের ধার বেঁয়ে এঁকে -বেঁকে চলেছে ঐ সুদুর পানে।

শৈশব, কৈশোর, যৌবন কেটেছে তোমার তরে।
রয়েছে কত মধুর স্মৃতি, জানাব তা কাহারে।

হায়! সেই “বুড়িভদ্রার” এ কি পরিণতি?
দু’ধারে উচু বাঁধ, নেই সেই প্রমত্তা গতি।
ছোট ছিলে বটে, তুমি ছিলে অনন্তা যৌবনা।
দু’কুল ছাপিয়া জোয়ারের জলে, ভ’রে উঠত অপার সম্ভাবনা।

তোমার তটেতে দল বেঁধে মোরা করেছি কত কেলি।
গড়েছি তোমার সাথে কত যে সুখের মিতালী।
ক্লান্তিহীন ভাবে সড়াৎ খেয়েছি, তেমার কুলের কাঁদার পরে।
অঙ্গে মেখেছি, সেই পবিত্র কাঁদা-মাটি সরে।

এপার-ওপার করেছি কত তোমার বুকে সাতার কেটে।
তোমার খরতর স্রোতে কত গাঁ ভাসিয়েছি, ভয় করিনি কো মোটে।

দু’কুল ছাপিছে জোয়ারের জলে, সে কি অথৈ পানি!
মন নেচেছে সে রূপ হেরিয়ে আনন্দে ভরেছে হৃদয়খানি।

মনে পড়ে বুড়িভদ্রা? একদা বৈশাখ মাসের শেষে।
মর্নিং স্কুল শেষে দলবেঁধে সবে তোমার চরেতে গেছি।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে জেলের নৌকায় গিয়ে উঠি।
জাল পাতা বড় বেংটি, বাঁধা আছে দুই ধারে দুই খুটি।

এর মধ্যে কখন বড়খোকন নদীতে দেছে ঝাঁপ।
স্রোতের টানে জালের ভিতর জড়ায়ে গেছে! হায়রে! বাপরে-বাপ!
আমরা কেউ টের পায়নি কো সে কোথায় গেল?
খানিক বাদে দেখি কাচি হাতে, জাল কেটে বেরিয়ে এল।
আমরা সবে ভয়ে থর থর কম্প, সবাই ছুটলাম বাড়ি।
ঘাসের বোঝা মাথায় নিয়ে যার যার সারি সারি।

এবার তোমার জলের মাছের কথা কিছু বলি—
নতুন প্রজন্ম বিশ্বাস যাবে না, সে যে কত মাছ ছিল!

কুচো চিংড়ি, চাকা চিংড়ি, হরিণা, বাগদা, গলদা কত ধরনের চিংড়ি।
পারশে, দাতনে, ভাঙান, ভেটকি, বোয়াল, আরও কত টেংরা।

এসব মাছ জোয়ারের জলে আনন্দে এসে চরাত।
আন্নে, ঘুন্সি, জাল-পাটাতে ভাটার শেষে আটকাত।
এ সব মাছ গ্রামের মানুষ আনন্দে ধরে খেত।
টাটকা মাছের স্বাদ নিত, আর প্রচুর আমিষের যোগান পেত।
টাটকা মাছের সে কি স্বাদ, সে কোনদিন ভোলা নাহি যাবে।
সেই দিন আর কখনো ফিরে কি আসবে?

তোমার তটেতে দু’ধরণের ঘাসে ভরে যেত।
এক ধরনের নরম ঘাস, কেন্নোমুড়ি বলত।
একটা শলার মাথায় মোড়ানো একটা ফুল থাকত।
আর এক ধরনের ঘাস জন্মাত, মাল্যে ঘাস বলা হত।
মাদুর বুনতে কাজে লাগত, গরুতেও ভাল খেত।

ধানের কথা না বললে তো রয়ে যাবে অপূর্ণ।
আমনের সময় একবার হত বজ্রমুড়ি আর ভাটেল, মিষ্টি স্বাদে পূর্ণ।
ধানের খেতে হাওয়ার দোলায় ঢেউ খেলে খেলে যেত।
তাই না দেখে মন খুশিতে নেচে নেচে উঠত।

বনের উড়া হেথায় হত দেখতে ভারি লাগত।
হরগোজার ঝাড় চরের কিনারে হেথায়-সেথায় জন্মাত।
আঁধার রাতে তার ভেতরে জোনাকির মিটি-মিটি আলোয় ঝিকমিক করত।
সে যেন প্রকৃতির আলোকসজ্জা, এক মোহময় রূপ ধরত।

এখন সে সব স্বপ্ন শুধু রূপকথা মনে হয়।
এখন আর নেই সেই স্রোত, নদীটা দেখে মনটা বিষাদে ভরে যায়।