আঁচল পাতা নদী : মাহমুদা রিনি

আঁচল পাতা নদী
মাহমুদা রিনি

আমার একটি নদী আছে, না একটা নয়–
অসংখ্য নদী আমার অববাহিকা জুড়ে বয়ে গেছে।
তারা আমার হৃদপিণ্ড ছুঁয়ে শরীর বেয়ে দুচোখের
মোহানায় এসে মিশে যায়।
তাদের কোনটির নাম ‘আঁচল পাতা নদী’, কোনটি ‘জলনুড়ি কাব্য’। কোনটি আবার ‘চঞ্চলা উর্বশী, কেউ আবার ছমছম নিক্কণে নৃত্যরত উথাল পাথাল কিশোরী।
চঞ্চল বাঁশিওয়ালা কিশোর নদও আছে, তারে আমি বলি পাগলা বাউল কিশোর। উথাল পাথাল কিশোরী যে নদীটা– তার সাথে ওর ভারী ভাব। লুকিয়ে চুরিয়ে কথা কয়, মোহানায় যেয়ে দেখা করে।

একদিন আঁচল পাতা নদীটি বললো আমার বুকে চর পড়েছে, আমি আর বয়তে পারছি না। শুনে উথাল পাথাল কিশোরী নদীটা একগাল হেসে বললো– তুমি বুড়ী হয়ে গেছো তাই আর বয়তে পারছো না। তুমি ধীরে সুস্থে বয়ে আসো আমি বাপু যাই, বাউল কিশোর অপেক্ষা করছে—-। বলেই সে ছলাৎ ছল মল বাজিয়ে ছুটে চললো।

আঁচল পাতা নদীটা তাকিয়ে থাকে— তার বুক ভারী হয়ে ওঠে। চাপা আর্তনাদ দীর্ঘশ্বাস হয়ে বয়ে যায়।
বাউল কিশোর তখন কিন্তু ছুটে এসেছিল। আঁচল পাতা কে সে বলেছিল তুমি আমাদের মায়ের মতন, তোমার বুকে চর! বলো তো ভেঙে চুরে ভাসিয়ে দিই!
আঁচল পাতা নদী তখন বলেছিল না থাক, এটাও প্রকৃতির নিয়ম, মেনে নিতেই হয়! আমি আসি আমার মতো– তোরা বয়ে যা।

এমন করে দিন যায়, হঠাৎই একদিন ঘুম ভেঙে উথাল পাথাল কিশোরী নদীটি দেখতে পায় তাকে যেন কারা দুপাশ থেকে বেঁধে ফেলছে। তার উথাল পাথাল বুকে বাঁধ পড়ে। ক্ষীণ হয়ে আসে তার গতি। চলার ছন্দে আর মল বাজে না।
ওদিকে বাউল কিশোর অপেক্ষা করে থাকে উথাল পাথাল নদীর জন্য। বাঁশিতে বিরহী সুর তোলে। একসময় দেখা হয় ঠিকই কিন্তু শীর্ণকায়, দুর্বল উথাল পাথাল কে দেখে সে চিনতে পারে না। কান্নায় ভেঙে পড়ে পাগলা বাউল কিশোর।
তারও চলার গতি ধীর হয়ে যায়।
ধীরে ধীরে সেও শুকিয়ে হয়ে যায় ক্ষীণকায় শীর্ণ কোন নদ। তার বাঁশিতে আর সুর ওঠে না।