চব্বিশ বছরের কুমারী : সোহাগী খাতুন

চব্বিশ বছরের কুমারী
সোহাগী খাতুন

শুনেছে কি কেউ চব্বিশ বছরের কুমারীর কথা?
যেখানে কুমারের বিয়ের বয়স একুশ!
বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই পেরিয়ে গেছে আঠারটি বছর!
এই তো সেদিন ভর্তি হয়েছিল স্কুলে!
ভাবতেই অবাক লাগে।
বিভিন্ন ব্যস্ততায় আয়নার সামনেও যাওয়া হয় না আর
তাই বয়সের ছাপটাও দেখার প্রয়োজন বোধ করে না ইদানিং।
সে-ই বা দেখবে কেন পাড়া-গাঁয়ে বাস যার?
চোখ কান খোলা রাখলেই সব জানা যায়।
কী সব কথায় চাহনি আর হাসাহাসি?
তবে তার সেদিকেও খেয়াল রেখে কোনো কাজ নেই।
জানার আগ্রহে বই ধরেছে
সচেতন সমাজ গড়ার কাজেও দ্বিধা নেই।
কিন্তু সে অপ্রিয় কথাগুলো যদি পরিবারের কাছে শোনে?
পাড়া গাঁয়ের লোক তো নাচবেই!
যে পরিবার একসময় উৎসাহ দেয় বড় হওয়ার,
ভবিষ্যৎ জীবনের নকশা তৈরি করে রাখে,
পাড়া গাঁ ও সামলায়;
সংগ্রামের চুড়ান্ত পর্যায়ে যদি তারাই বিশ্বাস ঘাতক হয়?
বলে যদি পড়িয়ে কী লাভ?কামায় করে পরকে খাওয়াবে।
আর যদি দেখায় সেই অজ্ঞ যুগের ছেলে মেয়ের পার্থক্য?
যেখানে ছেলেরই অগ্রাধিকার?
উঠতে বসতে দেয় যদি দীর্ঘ ভরণ পোষণের খোটা?
কেমন অন্তর্জ্বালায় দিন রাত পার হয় সেই মেয়ের? কেউ কি জানে?
জেনে কি লাভ?
পরিস্থিতির স্বীকার সবাই হয় না
একের কাছে যা দুঃসহনীয় অপরের কাছে তা উপহাস্য।

বিশ্বাস ঘাতকতা ও পরাজয়ের দিন মনের অবস্থা সিরাজের কেমন ছিল?
তার অন্তরের হাহাকার আজও বুঝতে পেরেছে কি কেউ?
পরাধীন না হলে, পরাজয় না হলে অনুভব করে বোঝা যায় না ততোটা।
কিন্তু বেইমানের দরজার কড়া নেড়ে দেখ
আড়াইশো বছর পরও বিশ্বাস ঘাতকতার গ্লানি,
তীব্র জ্বালায় দাহ্য করছে প্রতিটি রক্ত বিন্দুকে –
‘বিশ্বাস ঘাতক মীর জাফরের বংশধর’।
এ গ্লানি অব্যাহত আছে, থাকবে, চিরদিন থাকবে;
বেইমানের বেইমানীর শাস্তি ‘বিশ্বাস ঘাতক’।

তবুও সে বেইমানের শাস্তি হিসেবে চাই
হে প্রভু এদের জ্ঞান দাও।তাকে ধৈর্য্য দাও।

পাড়া গাঁয়ের কেচ্ছা আর কী বলা যায়?
যত সমস্যা তাদেরই গায়ে ভর করেছে।
বুড়ো হয়ে গেছে মেয়েটা,
বিয়ে করবে কে?
পরিবারকে ফোঁড়ন দেয়- তোমার মেয়ের চেহারা ভালো নাই,
আর পড়িও না, বিয়ে দিয়ে দাও।
যেন তাদেরই মাথায় ভর করে ভরণ পোষণ লেখাপড়ার খরচ চলে।
তাদের সন্তানই মানুষ হয় মানুষের মতো-
শিক্ষিত মেয়েদের পড়তেই বয়স শেষ,
ছেলে মেয়ে মানুষ করবে কবে?

ঘরে বাইরে পথে ঘাটে মানুষের সে-কী চাহনি?
মুখের উপর চটপট বলে দেয়- এই বিয়ে করবি কবে? তোর জন্য আইবুড়ো ছেলে পাওয়া যাবে না।
আর একসাথে পড়া ছেলের সাথে হলেও হতে পারে।
বাড়ি থেকে দিচ্ছে না তাতে কী?
নিজে একটা জুটিয়ে নে-না?
বাজারে চাকরির দাম খুবই কড়া,
তোর তা হবে না।

সদ্য বিবাহিত বন্ধু বান্ধবীরা ও বিয়ে নিয়ে হাসাহাসি করে;
অথচ তার সাথেই কাটানো দীর্ঘ সময়ের গ্লানি সে ও ভোগ করেছে।
কথোপকথনে ছেড়েছে কত দীর্ঘশ্বাস!
একদিন তাও ভুলে যায়।
বান্ধবীর মা বয়স কষে যেন নিজের ও বড়,
বান্ধবীকে নাম ধরতে বারণ করে, সম্পর্ক শেখায়;
বান্ধবী ও বিয়ের পর সমাজের বাধ্য মেয়ে হয়ে যায়।

অকারণে হাসি ঠাট্টার কারণ না হতে সে ঘরেই সময় কাটায়,
পরিবার শোনায় কোনার বউ,পড়শি শোনায় আকাশের চাঁদ ;
বাইরে গেলেও নাম পড়ে- ধেই ধেই করে বেড়ায় চরে।
কথাও বলতে হয় সাবধানে,
ভুল ধরলেই শিক্ষায় দাগ লেগে যায়;
জানে কি কেউ এসবের জবাব কি?
জিদ্দি হয়ে নিজের অবস্থান গড়া।