যশোরের নারী উদ্যোক্তা রুবিনার সাফল্যের গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক,যশোর:

রুবিনা বেকার ছেলেকে বিয়ে করে চারিদিকে অন্ধকার দেখছে। গরীব বাবার সংসারে থাকা আর সম্ভব হচ্ছেনা। কি করবে কোন উপায়ান্তর না পেয়ে এক বান্ধবীর পরামর্শে শেষ পর্যন্ত বাজার থেকে ব্যবসায়ীদের ছোট মোবাইল ব্যাগ তৈরীর কাজ নিল। ব্যাগ প্রতি দুই টাকা চুক্তিতে শুরু হল হস্তশিল্পের কাজ। বাইরে কোন কাজ ঠিক না করে স্বামী বশির আহমেদ স্ত্রীর কাজে সহায়তা করতে শুরু করলো। রুবিনা বাসায় ব্যাগ তৈরী করে আর বশির বাজারে নিয়ে আসে এইভাবে চলতে লাগলো দুজনার সংসার। 

বলছিলাম ১০ বছর আগের কথা। আজ রুবিনার যশোর উপশহর ও শহরের তেতুলতলা এলাকায় তিনটি কারখানা। রয়েছে ৫০টি পাওয়ার সেলাই মেশিন ও ২০টি পুট সেলাই মেশিন। প্রতিটি পাওয়ার মেশিনের মুল্য পড়েছে ১৮হাজার তিনশত টাকা। বর্তমানে মাসে ২০ হাজার টাকা কারখানা ভাড়া দিয়ে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সমাজের অবহেলিত ও স্বামী পরিত্যাক্তা নারীদের নিয়ে রুবিনা হস্তশিল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গড়ে তুলেছেন ‘গ্রামবাংলা হস্তশিল্প’ নামের কারখানা। যদিও করোনার প্রাদুর্ভাবে বর্তমানে তার ব্যবসার মন্দাভাব। রুবিনার কারখানায় যেয়ে দেখতে পেলাম, দেশের এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা মেনে নারীরা কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সাথে কথা বলে জানা গেলো প্রতিমাসে এ সমস্ত নারীরা ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করে। কাজের ফাঁকে স্বামী পরিত্যক্তা আসমা জানান, একটি সন্তান রেখে স্বামী চলে গেছে। আর কোন খোঁজ খবর রাখেনা। শশুরবাড়িতে স্থান নেই। যখন বেঁচে থাকার আর কোন অবলম্ব খুঁজে পাচ্ছিলাম না ঠিক সেই সময়ে এক বান্ধবীর কথায় এখানে আসি। প্রথমের দিকে সমস্যা হলেও এখন আমার প্রতি মাসে প্রায় ২০হাজর টাকা আয়। কথা হয় উপশহরের ছালমার সাথে। মাত্র ছয় মাস আগে এই কারখানায় কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে ১৫হাজার টাকা মাসে আয় করে বৃদ্ধ বাবা মাকে নিয়ে ভালভাবে বসবাস করছে। রুবিনার মতে তার তিনটি কারখানায় ৭০জন নারী কাজ করে। যার মধ্যে ৬০জনেরই কোন না কোন সমস্যা আছে। তিনি জানান, বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত নারীদের পাশে থাকাই আমার প্রধান উদ্দেশ্য। আমি প্রথমে তাদের ট্রেনিং দেই। তারপরে শুরু হয় তাদের ব্যাগ তৈরী। রুবিনা বলেন, আমি জোর করে বলতে পারি আমার এখানে কর্মরত নারীদের একসময় সমস্যা ছিল। সমাজে তারা অপমান নির্যাতিত হয়েছে, কিন্তু আজ তারা স্বাবলম্বী।
রুবিনার গ্রামবাংলার হস্তশিল্প কারখানায় তৈরী হয়, ল্যাগেজ তিন সাইজের, ছোট বিউটি ব্যাগ বিভিন্ন ডিজাইনের, অফিসে খাবার বহন করা বিভিন্ন ডিজাইনের ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ। এছাড়া বর্তমানে ব্যাগের পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধমূূলক পিপি, মাস্ক ও টুপিও তৈরী হচ্ছে তার কারখানায়।
রুবিনার স্বামী বশির আহমেদ জানান, তাদের তৈরী ব্যাগ যশোরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়িয়ে দেশের ১৬টি জেলায় সরবরাহ করে থাকে। বশির জানান, যেসব জেলায় ব্যাগগুলো পাঠানো হয় সেইসমস্ত জেলা থেকে আবার উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়। উল্লেখিত জেলাগুলোর মধ্যে ঢাকা, চিটাগাং, বরিশাল, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, খুলনা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, পাবনা, নিলফামারী, গাজিপুর, বাগেহাট, চুয়াডাঙ্গা রয়েছে। তাদের তৈরী ব্যাগ দেশের গন্ডি পেরিয়ে জাগরণী চক্রের মাধ্যমে ইতালিতেও পৌছে গেছে বলে জানান বশির আহমেদ।
কথা হয় উপশহর এলাকার চেয়ারম্যান এহসানুর রহমান লিটুর সাথে। তিনি বলেন, গ্রামবাংলা’র হস্তশিল্প যেভাবে সমাজের অবহেলিত মেয়েদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে তা অবশ্যই প্রসংশনীয়। সমাজে যে সমস্ত মেয়েদের একদিন কোন উপায়ন্তর ছিলনা আজ তারা স্বাবলম্বি। চেয়ারম্যান লিটু এই সমস্ত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সুদবিহীন ঋণ দিয়ে আরও উৎসাহিত করতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।
রুবিনা-বশির দম্পতি জানান, সমাজের অবহেলিত নারীদের সাথে নিয়ে হস্তশিল্পের কাজকে বড় করে গার্মেন্টস শিল্পে রুপ দিতে চাই। তার জন্য দরকার অনেক টাকার। তাই সরকারের পক্ষ থেকে যদি বিনা সুদে কোন ঋণ পেতাম তাহলে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারতাম।