রাসু পণ্ডিতের জীবনী : সুমনা ইসলাম

রাসু পণ্ডিতের জীবনী
সুমনা ইসলাম

রাসেদকে ছোট বেলায় সবাই রাসু নামে ডাকতো,পণ্ডিত উপাধি পাওয়ার পরেও ঐ নামটাই রয়ে গেছে। সবাই রাসু পণ্ডিত নামেই ডাকে। তিনি এমন একজন মানুষ, যার পড়নের পাঞ্জাবীটা ছিড়ে গেলে সেলাই করে পড়ে।পায়ের জুতাটাও তাই। তিনি বাড়িতে শাণ বাঁধানো পুকুর ঘাট থাকতেও গোসল করেন খালের ঘাটে। রাসু পণ্ডিত কোনো বাড়ি শালিস বিচারের জন্য না গেলেও তার বাড়িতে আসতো বিভিন্ন উঁচু দরের মানুষ পরামর্শের জন্য।একদিন চায়ের দোকানে এক লোক অন্য লোককে বলছে, আমি বড়ো বিপদে পরছিরে,,, বউডা গতকাল সোয়াল বেলা বাপের বাড়ি চইলা গেইছে, দোষটা অবশ্যই আমার বেশি ছিলো অহন যে কী হরি,বুঝবার পারছি না।সে লোকটা তাকে বললো তুই রাসু পণ্ডিতের পরামর্শ নিতে পারিস।এক যুবক অবজ্ঞা করে বললো যার নিজেরই ঠিক নেই তিনি আবার পরামর্শ দিবেন!উনি যদি ভালো হতো পরিবারের সঙ্গেই থাকতো,এমন একটা ঘরে থাকে যে ঘরের চালা দিয়ে পানি পরে বৃষ্টি নামলে। গায়ে তো একটা পাঞ্জাবী ছাড়া অন্য জামা কোনোদিন-ই দেখিনি।জুতা তো চৌদ্দ সেলাই করা।পণ্ডিত সাহেব তখন রাস্তা দিয়েই হেটে যাচ্ছিলো,সব কথা গুলো শুনতে পেলো।পণ্ডিত দশম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলেটির নিকটে গিয়ে দাঁড়ালো। ছেলেটির হাটু কাঁপতে শুরু করলো।নৈঃশব্দ্যে বললো যাকে আমার বাবা সম্মান করে তাকে নিয়ে আমার এই তাচ্ছিল্য! এ একেবারেই ক্ষমার অযোগ্য, না জানি এখন কি বলে আমায়!পণ্ডিত সর্বদা নিম্ন স্বরে কথা বলে।পণ্ডিত ছেলেটির মাথায় হাত রেখে বললো বাছা তোমার নাম কী?ছেলেটি বললো আমার নাম?আমা,,,,র নাম।আমার না,,,,।ভুলেই গেছে নিজের নাম।পণ্ডিত বললো, এতো কাজুমাজু কেনো!আমিতো মানুষ।মানুষ হয়ে মানুষকে ভয় পেতে নেই।তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে,আগামীকাল প্রত্যুষেই আমার বাড়িতে আসবে তুমি।ছেলেটি ভোর বেলায় সূর্যোয়ের আগেই হাজির পণ্ডিতের বাড়ি।দেখে পণ্ডিত সাহেব নামাজ শেষ করে তাসবি পড়তেছে। দুয়ারে অপেক্ষা করছে ছেলেটি। অতঃপর পণ্ডিত একটা কাঠের চৌকি ও একটা পিড়ি নিয়ে বাহিরে বের হলো।একটা আম গাছের নিচে বসলো এবং ছেলেটিকে বসার অনুমতি দিলো।পণ্ডিত বললো শোনো বাছাহ আমি একটা মেয়েকে ভালো বাসতাম একদিন মায়ের চরণে প্রস্তাব রাখি তাকে বিবাহ করার,মুহূর্তেই মায়ের মুখ থেকে জবাব এলো,দেকোদিনি,,পাগোল ছেলেডার কথা শুনো দিনি।আরে,,ওরে বিয়ে করলে দেহখান ছাড়া আর কী পাবি বল দেকিনি?নীলা বানুকে বিয়ে করলি, বাপের দশ বিঘে সম্পত্তি,আরে বাপ তুইতো দু বিঘে পাবি।ওষ্ঠের কিনার ঘেঁষে এক চিমটি হাসি উড়ে গেলো।অর্থবহ হাসিটা হেসেই মায়ের মতে বিয়ে করে আনলাম নীলা ভানুকে।শশুর সাহেবকে বলে দিয়েছি বাবা আপনার সম্পদের কোনো প্রয়োজন নেই আমার,আমার যেটুকো আছে তাই নিয়েই তুষ্ট থাকবে নীলা।কী নীলা থাকবে না?নীলা মাথার ভঙ্গিতে বুঝালো সহমত।মা প্রাই আমার মতে দ্বিমত পোষন করতো।একদিন আমার ভিতরে আক্ষেপ জাগ্রত হয়,আসলে কে আমায় ভালোবাসে!আসলে ভালোতো বাসে সেই, যে আমাকে বুঝে। আমার অগোচরে আমাকে খুঁজে। আমার চোখে জল আসার পূর্বাভাস যার অন্তরে নাড়া দেয়।যে শত ব্যস্ততায় আমাকে একটু দেখার আক্ষেপ ব্যক্ত করে।যে আমার অসুস্থতায় বিধাতার নিকট আকুল স্পৃহা নিয়ে মিনতি করে আরোগ্য লাভের আশে।কিন্তু সে কে?আমি একটু পরীক্ষা করে দেখবো।প্রথমে পরীক্ষা স্ত্রীকে।একটা মেয়েকে সঙ্গে করে এসে বললাম, নীলা!ও বড়ো অসহায় মেয়ে,ও খুব ভালো মেয়ে বিশ্বাস করো ও কোনো অসতী মেয়ে নয়।তোমার অনুমতি ছাড়াই বিবাহ করেছি।তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।এটা আমার অনুরোধ তুমি ওকে মেনে নাও।সহসা মনে হলো গরম তেলে বেগুন পরছে।অকথ্য কিছু পুঁতির মালা গাঁথতে গাঁথতে চললো বাপের বাড়ি।যা আমার সব চেয়ে অপ্রিয়। মানুষের মুখের ভাষা কেনো খারাপ হবে!চোখের সামনেই উড়ে গেলো সেই গভীর ভালোবাসা।যে ছিলো আমার শয়ন সঙ্গী, যে ছিলো আমার দুঃখ সুখ আদানপ্রদানের এক মাত্র আপন মানুষ। অথচ সে আজ কতো পর। অতঃপর পরীক্ষা ভাইকে।বললাম ভাই আমি খুব অভাবের মধ্যে আছি,কয়েকটা মাস যদি তুই বাবা–মাকে তোর কাছে রাখতিস? বা বা বাহ্।জমির ভাগতো সমানই নিয়েছো, এখন বাবা – মায়ের বোঝা আমার কাঁধে চাপাচ্ছো তাইনা!ভাইয়ের জবাব। বুঝে নিলাম ভাইকে।তারপর বোন।বোনকে বললাম, বোন তুই বাবার মৃত্যুর পর পরই বললি বিলের জমিটার টাকা দিয়ে দিতে। তাই বলছিলাম আমার নামে দলিলটা দিয়ে দে, তোকে টাকা ক্রমে ক্রমে দিয়ে দেবো। বোন বললো নারে দাদা তাই হয় নাকি আল্লাহ না করুক তোর যদি মৃত্যু হয়ে যায়, তখন আমার কী হবে বল?যে ভাই বোন একই মায়ের গর্ভে রয়েছি,একই দুধ পান করেছি।ভাত খেয়েছি এক থালায়। ঘুমিয়েছি এক বিছানায়।কতো দুষ্টমি, কতো গল্প, কতো পরামর্শ, ভাববার বিষয় তারাই কতো পর!অতঃপর এলাম ছেলের কাছে।বললাম বাছাহ আগামীকাল থেকে তুমি স্কুলে গাড়িতে যাবেনা হেটে যাবে,বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি ভালো নেই।উচ্চস্বরে বলে উঠলো ছেলে, তোমার মায়ের ওষুধের টাকা ঠিক থাকে। চারদিক চোখ ঘুরিয়ে নিলাম ‘মা শুনতে পেলো কি না।মা আমাকে যতই না বুঝুক তিনিতো আমার “মা” এই উঁচু দরের মানুষটাকে তো আমি অবজ্ঞা করতে পারিনা। তাকে তাচ্ছিল্য করার শিক্ষা আমি কোথাও পাইনি, না কোনো গ্রন্থে, না আমার বিবেক মানবীকতায়।

বাবা -মা ও সন্তানের সংশ্লিষ্টতার রঙ
এতোটা গাঢ়, যা পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রের জল দিয়ে ধুইলেও তার রঙ ম্লান হয়না।অথচ তারাও কতো পর। পণ্ডিতের এক গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। ক্ষণকাল পরে আবার বলতে শুরু করলো পণ্ডিত, একে একে সবাই যখন পরীক্ষায় হেরে গেলো আমি তখন বিমর্ষ হয়ে গেলাম।বুঝে নিলাম এই পৃথিবীতে আমি আপনহীন।পশ্চিমে সূর্যাস্ত, আমি তখন আর্তস্বরে প্রভুর নিকট প্রার্থনাকরলাম।হে প্রভু আমিতো এই পৃথিবীতে একা।আমি আপন মানুষ চাই।যে শতাব্দীর পরেও আমাকে স্মরণ করবে,আমি প্রাচীন হলেও আমারী প্রেম পূজারী হবে।সেদিন রাতে এক ছোট্ট শিশু আসে আমার কাছে স্বপ্নে।আমাকে বলে তুমি আর একা থাকবে না,আমার পরামর্শ নিলে।উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলাম চোখের দিকে বললাম, কী পরামর্শ বলোতো?আমি তখন পণ্ডিতের উপাধি পেয়েও ঈর্ষা জাগলো না লেশ মাত্র যে ছোট্ট শিশু আমায় কী পরামর্শ দিবে। কারন সবার থেকেই শেখা যায় সে ছোট হোক বা বড়ো হোক।সে আমায় বললো তোমার সকল সম্পদ দুই ভাগ করে একাংশ জলে ও একাংশ স্থলে ফেলে দাও।

আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না ঐ ছোট্ট শিশু কে,আর কী বলে গেলো।পরদিন আমার সম্পদ দুই ভাগ করলাম এবং জমানো টাকা দুই ভাগ করলাম।অতঃপর একাংশ আমার পরিবারে বুঝিয়ে দিলাম। অন্য অংশ বিক্রি করে সকল টাকা একত্র করে একটা জমি নিলাম, বৃদ্ধাশ্রম-অনাথ আশ্রম-ও এয়াতিম খানার নামে। সেখানে সব ফল বৃক্ষ রোপণ করলাম। ওদের খাবারের জন্য। আমি শান্তনা পেলাম আমার মৃত্যুর পরেও বেঁচে থাকবে এই বৃক্ষ। ফল দিবে।যারা এর আহার প্রাপ্ত, তাদের আত্না আমার জন্য দোয়া করবে।এটাই আমার শান্তি -শান্তনা,আমার সঙ্গী।এই আমার সফলতা। তাই তোমাকে বলি আমার পায়ে পুরনো জুতা,গায়ে পুরনো জামা বলে আমাকে গরীব ভেবনা।আমি অনেক ধনী।যা আমার প্রসারিত আত্মা জানে।দেখো, আমার জামাটা পুরনো হলেও ময়লা নেই।আমি তোমাকে কিছু উক্তি বলবো,তুমি সেটা উপদেশ স্বরুপ নিতে পারো।যতো বই পড়বে ততই নিজের অবজ্ঞা চোখের সামনে ভাসবে।দেখো যখন তোমার করতলে জ্বলন্ত আগুন রাখা হবে,মুহূর্তই তুমি দগ্ধ হবে।কিন্তু জ্বলতে জ্বলতে এক সময় তার অবসান ঘটে।ক্রমেই কয়েক ঘণ্টা, কয়েকদিন অথবা কয়েক মাস বা বছর।অতঃপর ম্লান হয়ে যায় সেই ক্ষত চিহ্ন। অতএব পরিস্থিতি যখন যেমন আসবে তখন তাকে মেনে নিবে।”ছাইটা হলো গিয়ে….স্মৃতি আর আগুনটা বর্তমান। “অতএব অতীতকে ভুলে যাবে,বর্তমানকে নিয়ে ভাববে।অজ্ঞদের থেকে দূরত্বে থাকবে, জ্ঞানীদের সংস্পর্শ হবে।মনে রেখো “একজন ঘুমন্ত ব্যক্তি আরেকজন ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগ্রত করতে পারে না।”সব সময় শিখতে চেষ্টা করবে।মনে রেখো”অজ্ঞ হওয়া যতো না লজ্জার বিষয়, তার চেয়ে বেশি লজ্জার বিষয় হচ্ছে শিখতে না চাওয়া।”

ছেলেটি বললো,পণ্ডিত সাহেব আপনার কাছে এসে অনেক কিছু শিখলাম।পণ্ডিত বললো,সকল প্রশংসা মহান প্রভুর, তার নামেই প্রশংসা করো।তার ইশারা ব্যতীত কিছুই হয়না। ছেলেটি প্রশ্ন করলো,পণ্ডিত সাহেব,আপনি কী করে বুঝলেন আপনার সম্পদ দুই ভাগ করে জলে স্থলে দেওয়ার বিষয়টা?জবাবে পণ্ডিত বললো, জলে যা কিছু ফেলা হয় তা আর ব্যক্তি জীবনে পার্থিব কালে কোনো কাজে আসেনা।কিন্ত জলের মৎস্য পোকা মাকর খেয়ে দোয়া দেয়।যা মৃত্যুর পরে কাজে লাগে।

আর আমার পরিবার, আমার মৃত্যুর পর হয়তো বছর খানেক, নতুবা দু বছর।অতঃপর ভুলে যাবে আমায়। কিন্ত ঐ বৃদ্ধাশ্রম, অনাথ আশ্রম, এয়াতিম খানার লোক আমার জন্য দোয়া করবে। এটাই অনন্ত কালের বেঁচে থাকা।