রেজাল্ট ৪.০৭ : সঞ্জয় সরকার

রেজাল্ট ৪.০৭
সঞ্জয় সরকার

বড়লোকের মেয়ে নন্দিনী। আমি গরীব। তবু ভাগ্যের হালকা চক্করে প্রেমটা হয়েই গেল। কি সৌভাগ্য আমার। খুশীতে আর মাটিতে পা পড়ে না আমার। বড়লোকের মেয়ের সাথে প্রেম করছি সেজন্য না,,,মূলতো কয়েকদিন যেতেই নন্দিনীকে একটা সভ্য মেয়ে হিসেবে আবিষ্কার করতে পেরেছিলাম আমি,খুসীটা সেই আনন্দে। ওরা দুই ভাইবোন। ওর ভাইটা ছোট। যখন প্রেমটা শুরু হয়েছিল নন্দিনীর ভাই তূর্জয় তখন ক্লাস সিক্সে। দেখতে দেখতে চারটে বছর কেটে গেল। এর মধ্যে কত যে ঘটনা,,,,। নন্দিনীর সাথে ফোনেই পরিচয় আমার, ফোনেই প্রেম, আর সেই প্রেমের লেজ বড় হতে থাকা। দিনে দিনে ওর ছোটভাই মানে আমার সম্ভাব্য শালাবাবুর সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়ে যেত। সে এক সেইরাম অনুভূতি। নন্দিনীর সাথে আমার কথা চলে রাত, দিন,,,,,সময়ে অসময়ে,,যেমন চাঁন্দের গায়ে কলঙ্ক এঁটে থাকে চব্বিশ ঘন্টা তেমনই। আহা, এমন প্রেম আর দু’টো নেই দুনিয়ায়, মাঝে মাঝে মনেহতো এমন প্রেমই মনেহয় ইতিহাস হয়,,,,,দেবদাস পার্বতীর পরের অধ্যায়টা আবার আমাদের নিয়েই লিখে না ফেলেন কোন রোমানাটিক লেখক,সেই ভয়ে মরি রাত দিন,,,,,রবি বাবু খ্যাতির বিরম্বনাটা যে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন,। তবুও ভাবি একটু সেলিব্রেটি হলে মন্দ কি,,,লেখুক না কেউ এই মাখো মাখো প্রেম নিয়ে একখানা ইতিহাস,,,থুক্কু উপন্যাস।
নতুন কাপড় কেনার আগে যেমন সবার গায়ের কাপড়ের দিকে নজর পড়ে,,ঠিক তেমনি আমার একটা নতুন রোগ আবিষ্কার করলাম,,,রিক্সাচালক থেকে শুরু করে ধান ক্ষেতের কৃষক যাকে দেখি তাকেই যেন লেখক মনেহয়,,ইচ্ছে করে তাকে টেনে ধরে চায়ের দোকানে বসিয়ে এককাপ চায়ের সাথে একটা ট্রিপল ফাইভ সিগারেট শেষ করতে করতে আমার প্রেমের কাহিনীটা শুনিয়ে দিই,,,আহ্ লিখতে পারলে কি সুপারহিটই হবে না? পাবলিক একেবারে গুলিয়ে ঢকঢক করে গিলে খাবে,,,বিশেষ করে ছ্যাঁকা খাওয়া দেবদাসেরাতো ফিদা হবেই হবে। দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টানোর কারণে সবাইকেই কবি সাহিত্যিক মনেহলো ঠিকই, কিন্তু কাউকে আমার অমর প্রেমের কাহিনীটা আর শোনাতে পারলাম না,,,,এ আমার ব্যর্থতা নয় গো, ভদ্রতা বলতে পারেন। কিন্তু থেমে থাকার পাত্র তো আমি নই,,একথা উত্তর পাড়ার হিরুজ্যাঠা ঠিকই জানতো, তাই নিজের মধ্যে কবিসত্ত্বা ইনস্টল করে লিখে ফেললাম একখানা বই,,,,বিশ্বাস করেন তার পড়েই বুঝতে পারলাম ভাগ্যে থাকলে ঠেকায় কে? এই প্রেম যে পুরোটাই স্বর্গের ঝরে পড়া ফুলের নির্যাস থেকে উৎপাদিত। বইয়ের পাতায় পাতায় তা ইতিহাস হয়েই গেল, আঁটকানো গেলো না,,,।
আমার শ্বশুর বাড়ীর মধ্যে দু’টি ছেলে ডাক্তারি পড়ে,,,ওরেব্বাবা,,,,শুনলেই কেমন ভাব ভাব লাগে চোখে মুখে,,,তো আমার শ্বাশুড়ীরও শখ জেগেছে ছেলেকে কিছু একটা বানাতেই হবে,,,রাত দিন তাকে নিয়েই থাকেন শুনলাম। সেই সাথে যুক্ত হইল আমার লুতুপুতু নন্দিনী। ভাইয়ের মেধা যেমনই হোক তাকে বর্তমান গ্রাফিক্স হিসেবে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়াতেই হবে। পড়ে যে কি হবে সেটা বোধকরি সকলেই জানতেন, তাই সোজা গিয়ে কষ্ঠি পাথরে মাথা ঠুকে মরলো আমাগো নন্দিনী। কথাটা প্রথমে জানতাম না, জানলাম সেইদিন, যেদিন রাতে ফোনে কথা বলার সময় শুনলাম সে নাকি পুরো এক পোয়া চাউলের ভাত নিয়ে বসেছে খেতে,,,,আমি কম খাই, তাই শুনেই চোখদুটো বড় বড় গাঁধাফুলোর মতো ফুটে উঠলো আমার,, কেন? প্রশ্ন করতেই নন্দিনী বললো ভাইয়ের রেজাল্ট ভালো হওয়ার জন্য জ্যোতিষের কাছে ধন্না দিয়েছিল, জ্যোতিষী বলেছে তিন মাস নিয়ম করে তাকে আর আমার শ্বাশুড়িকে প্রতি রাতে একপোয়া চাউলের ভাত আধাসিদ্ধ করে খেতে হবে। শুনে আরো অবাক হলাম,,,,রেজাল্ট ভালো হবে শালাবাবুর আর এক গামলা ভাত খেতে হবে নন্দিনী আর তার মায়ের, কেন? রোগ একজনের আর ইনজেকশান অন্যের শরীরে? কি আজব কেরামতিরে বাবা,,,,,,তবে জ্যোতিষ শাস্ত্র সম্পর্কে আমার খুববেশি জ্ঞান নেই তাই চুপসে গিয়ে আকাশ কুসুম ভাবতেই থাকলাম ,,,, আজব, আজব,,,,।
তারপর নদীর স্রোতের মতই দিনের ঢেউ বইতে বইতে তার গন্তব্যের দিকে ধা করতে লাগলো। শ্বাশুড়ী মা ছেলেকে নিয়ে পড়তে বসান,,,,,,,যত সময় ছেলে পড়ে তিনি ঠুঁটো জগন্নাথের মতো পাশে বসে থাকেন নিদ্রাহীন। আমার মনে কিন্তু সেই প্রশ্নের ঝড়,,,,,,,,যদি জ্যোতিষের কেরামতিতে স্বরস্বতীর কৃপা জোটে তবে রাতের পর রাত জেগে এত পড়ে হবে কি? মজার ব্যপার হলো প্রশ্ন যতই জোরে বর্ষার মতো ধেয়ে আসুক না কেন,,উত্তর চাওয়ার সাহস হয়নি কোথাও,,কি জানি জ্যোতিষ বাবাজি ক্ষেপে গেলে কোন শনিকে পেছনে লেলিয়ে দেয়?
কিছুদিন পড়ে আমার নন্দিনী পাল্টে গেল। সেই চার বছরের প্রেমে ভাটির টান উঠলো। নন্দিনী আর আমার জন্য অপেক্ষা করে না, ফোন করে না। ফোন করলে ধরে না,,ধরলে কথা বলে না,, কথা বললে তাতে কোন টান নেই,,,যা একটু টান আছে কিন্তু তার ব্যস্ততা ভীষণ সময় নেই। বুঝলাম একটা প্রেমের উপাখ্যানে ইতিহাস হতে চলেছি। মাঝখান থেকে খবর পেলাম নন্দিনী অন্যকারো কাছে বন্দিনী হয়ে গেছে।
শ্বাশুড়ি মা তখনও ছেলেকে নিয়ে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন স্বরস্বতীর পায়ে ধন্না দিয়েই চলছে,,,বেচারা স্বরস্বতীর হলো মহা বিপদ। ফল যা’ই হোক কোন কৃতীত্ব সে পাবে না তাই ভেবে,,,,,,ছেলে এ প্লাস পেলে নৈবেদ্যটা যে ঐ জ্যোতিষের ঘরেই যাবে।
শালা বাবুর পরিক্ষা শুরু হলো। ততদিনে নন্দিনী আর আমার নাই। যেখানে বন্দিনী হয়েছে সে সেখানেই পাকাপোক্ত ঘর বেঁধে নিয়েছে। কিন্তু বাতাসের কৃপায় খবরটা পাই আমি মাঝে মধ্যেই।
পরিক্ষা শেষ হয়েছে শালাবাবুর। দীর্ঘ বিরতীর পরে রেজাল্টের পালা। এর মধ্যে পৃথিবীকে অন্ধকার আর সংকটপূর্ণ করে করোনা নামের ভাইরাসের উৎপত্তি, সকলেই দিশেহারা, প্রতিটা মানুষে সাথেই যেন প্রতিটা মানুষের সাপে নেউলে সম্পর্ক। কেউ কাছে আসতে চাইলে এক লাফে তিন হাত পিছিয়ে যায় আরেকজন। কিন্তু তাইবলে তো পরিক্ষার রেজাল্ট বন্ধ হয়ে যাবে না, তাই না?
শালাবাবুর রেজাল্ট বের হয়েছে। যোগাযোগ না থাকলেও অন্তরে টানটা ভীষণ আছে। চার বছরের শালাবাবু বলে কথা। শ্বাশুড়ি মাকে যে ভীষণ লাভ করতাম আমি।
জ্যোতিষ শাস্ত্রের কেরামতি কি হলো তা জানতে বুকটা ধুকফুক করেই চললো। মনে মনে একশ একবার প্রণাম ঝাড়লাম ভগবানের কাছে,,,হে ভগবান শালাবাবুকে জিপিএ ৫ পাইয়ে দাও। মাঝ মাঝে মনেহতো কেউ যেন মাথার পেছনে সজোরে চাটি মেরে বলছে বেটা ভগবানকে ডেকে

সঞ্জয় সরকার,,, কবি ও গল্পকার। প্রতিষ্ঠাতা ঝংকার সাহিত্য গ্রুপ