মৃত্যু উপত্যকা থেকে : মাহমুদা রিনি

মৃত্যু উপত্যকা থেকে
মাহমুদা রিনি

তোমাদের বলছি সন্তানেরা, যারা দূরে আছো, অনেক দূরে—- তাদের বলছি। বিশ্বব্যাপি মরণঘাতী যে ভাইরাস এর আক্রমণ চলছে জানি পৃথিবীর কোন প্রান্তের মানুষই এর আক্রমনের বাইরে নয়। বিধাতার এই মৃত্যু যজ্ঞে আহুতি দেয়ার জন্য হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ,রাষ্ট্র ভুলে এককাতারে পৃথিবীর সব মানুষ। জীবন নামের নাট্যমঞ্চের কুশীলব আমরা। যবনিকা পড়লেই মঞ্চ ছেড়ে বিদায় নিতে হবে।

সন্তানেরা, তোমরা সাহস হারাবে না। এই যুদ্ধে তোমাদের জয়ী হতে হবে। পৃথিবীর এই পরিবর্তন তোমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে। আমরা যারা পুরনো তারা যদি না থাকি এই না থাকাটা তোমরা সহজ ভাবে মেনে নেবে। তাদের জন্য দুঃখ করে মনোবল নষ্ট করবে না। তাদের ফেলে যাওয়া স্বপ্ন গুলো খুঁজে দেখার চেষ্টা করবে। তাদের অসমাপ্ত কাজের যেগুলো নতুন পৃথিবীর জন্য মঙ্গলকর সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করবে।
একটা কথা মনে রাখবে, মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু যে মৃত্যু বিশ্ব ব্যাপি শিক্ষা দিতে সক্ষম সেই মৃত্যুতে শোক করো না, শিক্ষা নাও। পিছনে তাকিয়ে দেখো গত এক শতাব্দী ধরে আমরা পৃথিবীর মানুষেরা কি কি করেছি। পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ বা এই মনোরম সৃষ্টি পৃথিবীতে সকল প্রাণের জীবন উপযোগী। প্রকৃতিও একটা সৃষ্টিশীল নিয়মের মধ্যে চলে। কিন্তু তোমরা শুধু একটা শতাব্দীর বিশ্লেষণ করে দেখো। মানুষ কি করেছে প্রকৃতির সাথে, মানুষের সাথে। বড় বড় মহাযুদ্ধ হয়েছে শুধু মাত্র মানুষ মারার জন্য। মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের চক্রান্ত, জাতিতে জাতিতে বিভেদ। ধর্মে ধর্মে লড়াই। একদিকে সম্পদের প্রাচুর্যকে কুক্ষিগত করে মানুষ মারার প্রতিযোগিতার দৌড়ঝাঁপ। অপর দিকে না খেতে পেয়ে কঙ্কালসার মানুষের মৃত্যুর মিছিল। এর সবই মানুষ নিজ নিজ ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য করেছে। সম্পদের সমবন্টন, মানুষে মানুষে ভাতৃত্ববোধ, মানবিকতা, মানবাধিকার, ধর্মীয় বোধ বা ধর্মের মূল বক্তব্য এর সবগুলিই মানুষ চরম ভাবে উপেক্ষা বা সীমা লঙ্ঘন করেছে। আজ এই মৃত্যুর মিছিল থেকে যারা বেঁচে ফিরবে তারা এই কথাগুলো ভেবে দেখবে আর নতুন করে পৃথিবীটা সাজানোর চেষ্টা করবে।
ভেবে দেখো মানুষ সৃষ্ট উশৃংখলতায় কি পরিমাণ বিপর্যস্ত প্রকৃতি। আবাসভূমি থেকে শুরু করে বন- বনাঞ্চল, নদী- সাগর এমনকি সাগরের তলদেশ পর্যন্ত মানুষের উশৃংখল ব্যবহারে পর্যুদস্ত। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম প্রকৃতি এত বিশৃঙ্খলা মনে নেবে না, প্রতিশোধ নেবেই। তাই এই অবধারিত বিপর্যয় আমরা ডেকে এনেছি, মাশুল আমাদেরকেই দিতে হবে।
সন্তানেরা, আমাদের জন্য ভেবো না, আমরা যারা তোমাদের পৃথিবীতে এনেছি তারা তোমাদের জন্য শান্তিময় আবাসভূমি দিয়ে যেতে পারিনি। এ দায় আমাদের। আমাদের ভুলকে ক্ষমা করে তোমাদের অনাগত সন্তানের জন্য একটা সুন্দর, শান্তিময় বাসযোগ্য পৃথিবী গড়বে তোমরা। এই সময়ের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে, শোক করবে না।
যদি আর দেখা না হয় মনে রেখো পৃথিবী একদিন শান্ত হবে, নির্মল হবে। সুন্দর, সুশৃঙ্খল সেই পৃথিবী নির্মাণের কারিগর হবে তোমরা। এই সময় থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকৃতি ও মানুষকে সম্মান করতে শিখবে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অদৃশ্য এক জীবাণুর ক্ষমতার কাছে তাবড়-তাবড় ক্ষমতাধর পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খেলা করা নেতা, গোষ্ঠী, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা আজ ঘরে খিল এঁটে বসে আছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সামরিক অস্ত্র-সস্ত্র কোন কাজেই লাগছে না। তাদের বোধহয় হলো কি জানি না যে মানুষ মারার অস্ত্র দিয়ে জীবাণু মারা যায় না। মানুষ বাঁচানো অস্ত্র বানাতে হবে জীবাণু মারার জন্য।
মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা ধর্মীয় গোষ্ঠীরও যেন বোধের উদয় হয় ধর্মের মূল বিষয়ের দিকে সেদিকেও আগামী পৃথিবী খেয়াল রাখবে আমরা এমনটাই আশা রেখে যেতে চাই।
সর্বোপরি আগামী দিনের নাগরিকেরা, আমাদের সন্তানেরা তোমরা ভয় পাবে না। সুদিন আসবে তোমাদেরই হাত ধরে। তোমাদের আগামী পৃথিবী সুন্দর হোক।
———— করোনা আক্রান্ত দেশের সন্তানেরা যারা বিদেশ বিভুঁইয়ে আছে সেই সব সন্তানদের জন্য—–
মা- বাবার অনুভূতি……….

মাহমুদা রিনি
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ
যশোর জেলা শাখা