নিলুফার মঞ্জুর একজন অধ্যক্ষই ছিলেন না, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান

মাছুম বিল্লাহ : নিলুফার মঞ্জুর একজন অধ্যক্ষই ছিলেন না, তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান

সানবিমস স্কুলের প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী, হাজার হাজার বর্তমান ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও শিক্ষক সমাজকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিয়েছেন মেধাবী ও আদর্শ শিক্ষক নিলুফার মঞ্জুর। তিনি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্ট ও এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যন সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর সহধর্মিনী ছিলেন।

তবে স্বামীর পরিচয়ের চেয়ে তিনি নিজের পরিচয়েই বেশি পরিচিত ছিলেন গোটা বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজে। তার বাবা ডা. মফিজ আলী চৌধুরী ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৩ সালের মন্ত্রিসভার সদস্য।

জনতা ব্যাংক থেকে দশ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ডেস্ক আর বেঞ্চ কিনে ইন্দিরা রোডে নিজের বাসায় যে বিদ্যালয়ের গোড়াপত্তন করেছিলেন সেই সানবিমসের আজ ধানমণ্ডি ও উত্তরার দুটি শাখায় প্রায় তিন হাজার শিক্ষার্থী পড়াশুনা করছে।

প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা তাকে ’ট্রু নেশন বিল্ডার’ হিসেব অ্যখ্যায়িত করেছেন, যা একজন শিক্ষকের বিশাল পাওনা, বিশাল অর্জন। সানবিমস পরিবারের তিনি একজন আদর্শ মাতা, তাকে হারিয়ে মেন্টরবিহীন হয়ে পড়েছেন বলেও ফেসবুক পেজে মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ।

দেশের বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার ক্ষেত্রে এক নক্ষত্র। ১৯৭৪ সালে তিনি আধুনিক ও বৈশ্বিক শিক্ষায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করার নিমিত্তে প্রতিষ্ঠা করেন সানবিমস স্কুল। তিনি বলতেন, ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি ভালোভাবে শিখতেই হবে, তবে বাংলা ভাষাকে অবহেলা করে নয়, বাংলার কালচারকে অবহেলা করে নয়। বাংলা শেখার ক্ষেত্রে কোনো আপস নেই।

তিনি বিশ্বাস করতেন, ছোটবেলায় শিশুরা সহজেই ভাষা আয়ত্ব করতে পারে। নতুন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রয়োজন, প্রয়োজন ইংরেজি ভালোভাবে শেখা। প্রয়োজন বৈশ্বিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের খাপ খাওয়ানো। বিশ্বমানের জ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতা বাড়ানোর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা দেশ ও বিদেশে সফলতার সাক্ষর রাখবে বলে তিনি ছিলেন দৃঢ়বিশ্বাসী।

সানবিমসের হাজার হাজার প্রাক্তন শিক্ষার্থী দেশ ও দেশের বাইরে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজ ও এডেক্সেল- এই দুটি বোর্ডের অধীনে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর পরীক্ষা ও ফলাফল ব্রিটিশ কাউন্সিল নিয়ন্ত্রণ করে। ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যসূচি যুক্তরাজ্যের বাস্তবতায় তৈরি। তাই পুরো পড়াশুনা ইংরেজিতে। তবে বাংলা ও বাংলাদেশ ষ্টাডিজ বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে পড়ানো হয় এই প্রতিষ্ঠানে।

আমরা ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় এবং ইংরেজি শেখা ও শেখানো নিয়ে যত তর্কই করি না কেন, ইংরেজি না শিখলে বৈশ্বিক দৌড়ে যে আমরা পিছিয়ে পড়ি, পড়ছি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের একজন মেধাবী নাগরিক ভালো ইংরেজি না জানার কারণে ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার একজন নাগরিকের চেয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও উন্নত বিশ্বের যে কোনো দেশে অনেক কম বেতন পান। ইংরেজি আমাদের শিখতেই হবে, শেখাতে হবে নতুন প্রজন্মকে। সেই ধারাই প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন সানবিমসের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর। একইসঙ্গে বাংলাকেও দিয়েছেন যথাযথ মর্যাদা ও স্থান।

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, করেছেনও। কুড়িয়েছেন অশেষ সম্মান আর ভালবাসা। তিনি নিজেই বলেছেন, ‘শিক্ষকতায় না আসলে এত সম্মান পেতাম কিনা সন্দেহ।’ তিনি বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখতেন। আর তাই বলেছেন, ‘বর্তমানে যারা সামবিমসে পড়ে, তাদের বাবা-মারাও এখানকার শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে, তাদের চেয়েও বর্তমানের প্রজন্ম অনেক এগিয়ে’

নিলুফার একজন আদর্শ মা-ও ছিলেন। তার ছেলে বলেছেন, ‘আমার বয়স পঞ্চাশ বছর। অথচ আমার পুরো বয়সে একদিনও মাকে কাজ ছাড়া দেখিনি। আমাদের কারখানায় যেসব বিভাগে শুধু পুরুষরা কাজ করতেন, পরে সেসব বিভাগে নারীদেরও নেয়া হয়েছে এবং তারা সবাই ভাল করছেন। এই লিঙ্গ বৈষম্যহীন কারখানার গড়ার পেছনে মায়ের অবদান অনেক।’ ছেলেদের কাজ আর মেয়েদের কাজ আলাদা বলে কিছু নেই- এই শিক্ষাই তিনি দিয়েছেন তার পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে ও সমাজে। নারীর ক্ষমতায়নে তিনি ছিলেন এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। কথায় নয়, কাজে।

সানবিমস থেকে যত শিক্ষার্থী এ পর্যন্ত বের হয়েছেন ও পড়ছেন- সবার নাম ও ব্যাচ তিনি অনায়াসে বলে দিতে পারতেন। যেটি প্রকৃত শিক্ষকের একটি বিরাট গুণ, যে গুণের অধিকারী শিক্ষকের সংখ্যা খুব একটা বেশি নেই। আর একটি গুণ হচ্ছে- কিভাবে ভালো ব্যবহার দিয়ে মানুষের মন জয় করা যায়। একজন প্রকৃত শিক্ষকের এ দুটো গুণ থাকতেই হয়।

ফেসবুকে একজন শিক্ষার্থী বেনামে লিখেছেন এভাবে- A great lady who has nurtured many children to shape a new generation of Bangladeshis. In a way, the parents had also benefited by having their children under her protection. The family inspires others to lead a meaningful life, prosper and yet remain committed to greater causes in the society.

শিক্ষক সমাজের নিকট নিলুফার মঞ্জুর একটি অনুরকরণীয় দৃষ্টান্ত। কিভাবে একটি বিদ্যালয়কে সামান্য চারাগাছ থেকে বিশাল মহীরুহে রূপান্তর করা যায় তার একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত, বিশেষত ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার ক্ষেত্রে স্থাপন করেছেন নিলুফার মঞ্জুর। ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে আমাদের দেশে। এখানেও রয়েছে নিলুফার মঞ্জুরের বিরাট অবদান।

লেখক: মাছুম বিল্লাহ, শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত ভাইস-প্রেসিডেন্ট
বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশেন (বেল্টা) এবং সাবেক ক্যাডেট কলেজ, রাজউক কলেজ ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যিালয় শিক্ষক
ইমেইল: [email protected]