হারানো যন্ত্রণা : নুর মোহাম্মদ মেহেদী

নুর মোহাম্মদ মেহেদী । টাইম ভিশন ২৪

ছোট গল্প  হারানো যন্ত্রণা 
নুর মোহাম্মদ মেহেদী

প্রায় ৮ বছর পর দেশে ফিরলাম।হঠাৎ বাজারে দেখা হলো আমার সেই প্রাণ প্রিয় বন্ধু ফারহানের সাথে।সাথে দেখলাম একটা ৪/৫ বছরের একটা মেয়ে।হয়তো তার মেয়ে।

-কিরে বন্ধু কেমন আছোত??কতো দিন পর দেখে।(আমি)
-আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তোর কি খবর??এতো দিন পর দেশে আসতে মন চাইলো??(ফারহান)
-মন চাইলো তাই আসলাম।এটা তোর মেয়ে নাকি???
-হুম।
-নাম কি তোমার আম্মু??(আমি)
-মাইশা(মেয়েটা)
-তো ওর আম্মুর কি খবর??

প্রশ্নটা করতেই ফারহানের মুখটা দেখলাম মলিন হয়ে গেলে।মুখটা দেখে বুঝতে পারলাম হাজারো কষ্ট বুকে জমাট করে রেখেছে।
আমি ফারহানের হাতটা ধরে বললাম

-দোস্ত কিছু কি হইছে??চুপ করে আছিস কেনো??(আমি)
-একদিন বাসায় আসিস সব বললবো।
-ঠিক আছে।

মাইশাকে কিছু কিনে দিয়ে নিজের বাসায় আসলাম।কয়েকদিন পর হাতে সময় নিয়ে ফারহানের বাসায় গেলাম।দরজায় নক করতেই দরজা খুলে দিলো।বাসায় ডুকে বসলাম।

-মাইশা কোথায়?(আমি)
-ঘুমাচ্ছে।
-দোস্ত এবার ভাবির মূল কাহিনীটা বলবি।
-একটু বস চা করে আনছি।

চা নিয়ে এসে ফারহান বলতে শুরু করলো

সময়টা তুই বাহিরে যাবার ১ বছর পরের কথা।নতুন চাকরিতে জয়েন করেছি।বেতন মোটামুটি ভালো।মেঘা(ফারহান বউ) ছিলো আমার কলিগ।ওর সাথে সম্পর্ক ছিলো বন্ধুর মতো।একদিন অফ ডে বৃষ্টিতে গোসল করছিলাম।তারপর হলো জ্বর।জ্বরের কারনে কয়েকদিন অফিসে যেতে পারি নি।ডাক্তার দেখাইছি কিন্তু লাভ হলো না।একা মানুষ চলাফেরা করা খুব কষ্ট ছিলো।রান্না করা বাসা পরিষ্কার করা,খুব কঠিন হয়ে যেতো।একদিন অফিস টাইমে ওর কল আসলো।

-হ্যালো ফারহান।(মেঘা)
-হে মেঘা বলো।
-অফিসে আসছো না যে।
-শরির টা ভালো না তাই আসি না।
-কি হইছে তোমার??
-হালকা জ্বর আসছে।ঠিক হয়ে গেলে অফিসে যাবো।

বসকে ফোনে জানিয়ে দিয়েছিলাম।ওইদিন বিকালে হঠাৎ আমার বাসায় মেঘা আসলো।শুধু ওই দিন না প্রতিদিন অফিস শেষ করে আমার বাসায় আসতো,আমার দেখাশুনা করতো,ওর প্রতি একটা মায়া জন্ম নিলো।ভালোবাসা সৃষ্টি হলো

সুস্থ হয়ে অফিসে গিয়ে সরাসরি ভালোবাসার কথাটা ওকে জানালাম।ও মুচকি হেসে মাথাটা নারিয়ে হ্যা সূচক সম্মতি দিলো।তারপর শুরু হলো নতুন একটা অধ্যায়।বন্ধু থেকে রূপান্তর হলো ভালোবাসায়।ছয় মাস প্রেম করার পর বিয়ে করলাম তাকে।শুনেছি প্রেম করে বিয়ে করলে নাকি বিয়ের পর ভালোবাসা বাতাসের সাথে ঘর থেকে বের হয়ে যায়,কিন্তু আমাদের ভালোবাসা সুনামির মতো ডুকতে থাকলো।চলছিলো আমাদের জিবন,রাগ অভিমান ভালোবাসা নিয়ে চলতো আমাদের জিবন প্রতি সাপ্তাহে একদিন বাহিরে ঘুরতে যাওয়া।প্রতি রাতে ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতাম।মাইশার নাম মেঘার নামেন প্রথম অক্ষরের সাথে মিল রেখে রাখা।কতো কি ভাবতাম আর হাসতাম।

কয়েক দিন পর আমাদের কোলজুরে মাইশা আগমন করলো।মাইশাকে দেখে কতটা খুশি হয়েছি তা হয়তো বুঝাতে পারবো না।মাইশাকে দেখা শোনার করার জন্য মেঘাকে বললাম চাকরিটা ছেরে দিতে কিন্তু সে উল্টা আমাকে ছেরে দিতে বললো।আমি মাইশার কথা ভেবে চাকরিটা ছেরে দিলাম।মেঘা অফিস করতো আর অফিস টাইমে আমি মাইশাকে দেখাশুনা করতাম।মেঘা চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে নতুন একটা কম্পানিতে চাকরি নিলো হাফ টাইম চাকরি করার জন্য।সে হাফ টাইম চাকরি করতো যাতে মাইশার কোনো সমস্যা না হয়।মাইশার যখন ৬ মাস তখন থেকে শুরু হলো মেঘাকে হারানোর দুর্যোগ। মেঘা হাফ টাইম চাকরি করতো কিন্তু ইদানীং বাসায় ফিরে রাত ৮/৯ টার দিকে।বাসায় এসে মাইশাকে নিয়ে ঘুমিয়ে পরতো।কোনো কথা বলতো না আমার সাথে।ভাবতাম হয়তো কাজের চাপ বেশি,কিন্তু একদিন রাতে ১২ টা ছুঁই ছুঁই কিন্তু মেঘার আসার কোনো নাম নেই মাইশার কান্নার চিৎকার আমার বুকের একপাশ ছিদ্র করে অন্যপাশ দিয়ে বের হতো।মাইশার ক্ষুদার চিৎকার আমি বুঝতাম।তখন বাজার থেকে দুধের পেকেট কিনে মাইমাকে খাওয়াতাম।মেঘা রাত ১২ টায় বাসায় ফিরলো।কিছুটা মাতাল হয়তো কোনো পার্টি থেকে এসেছে।শুধু ওই দিননা একেক দিন একেক জন বাসায় দিয়ে আসতো।কখনো বাসার দাড়োয়ান, কখনো গাড়ির ড্রাইবার।একদিন রাত ১১ টার দিকে মেঘার অফিসেন বস মেঘাকে বাসায় দিয়ে আসলো, মাইশার কষ্ট হবে বলে কিছু বলতাম না।

খুজ নিয়ে জানতে পারলাম মেঘা এবং তার বসের মধ্যে কিছু একটা চলছে।মেঘা যখন অন্য দিনেন মতো রাত করে বাসায় ফিরলো আমি দরজা খুলে মেঘাকে একটা থাপ্পড় মারলাম।

-কি হইছে তোমার, একটা দুধের বাচ্চা রেখে প্রতি দিন রাত করে বাসায় ফিরো।মেয়েটার কান্না তুমি শুনতে পাও না।এ কথা ছিলো তোমার-আমার??

মেঘা কোনো কথা না বলে চুপ করে মাইশাকে নিয়ে শুয়ে পরলো।

একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি মেঘা পাশে নেই,পুরো বাসা খুজলাম কিন্তু পেলাম না।খেয়াল করলাম বিছানায় একটা চিরকুট। চিরকুটে লেখা

প্রিয় ফারহান আমি আর তোমার সাথে সংসার করতে পারতো না।আমি অন্য কাউকে নিয়ে ভবিষ্যৎ দেখছি,মাইশাকে দেখে রেখো।বিদায়
চিরকুটে এতো টুকুই লেখা ছিলো।স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আমি।দড়ি দিয়ে নিজেকে শেষ করে দিতে চয়েছিলাম, মাইশার কথা ভেবে পারিনি।মেঘাকে এই শহরে আর কোনো দি দেখিনি হয়তো অনেক শুখে আছে সে।সেই ছোট্ট মাইশা আজ কতো বড় হয়ে গেছে,মাজে মাজে ভাবি যে মাইশা না থাকলে হয়তো মেঘার কষ্টটা ভুলে বারবো না।মাইশা যখন বাবা বলে ডাক দেয় পৃথিবীর সব কষ্ট খুব তুচ্ছ মনে হয়।এই হলো আমার কাহিনী।

দেখলাম ফারহান চোখের পানি মুছচ্ছে। আমি ফারহানকে শান্তনা দেয়ার জন্য কোনো বাসা খুজে পাচ্ছিলাম না।চুপ করে মাথাটা নিচু করে ওর বাসা থেকে বের হয়ে গেছি।আমি জানি না কতটা কষ্ট পেয়েছে ফারহান, কিন্তু ওর চোখের পানি বলছে ও কথটা কষ্ট পেয়েছে।টুক করেই নিজের চোখ থেকে কয়েক ফোটা লবণাক্ত পারি বের হয়ে গেলে।
সমাপ্ত।

নুর মোহাম্মদ মেহেদী
চৌধুরী বাজার, মুছাপুর
নোয়াখালী