এবারের ঈদ, আমার ঈদ : ড. শাহনাজ পারভীন

এবারের ঈদ, আমার ঈদ
ড. শাহনাজ পারভীন
“ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।”

প্রতি বছর পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ দেখা গেলেই ঘরে ঘরে, এই গানে আনন্দে নেচে ওঠে মন! কিন্তু এ বছর? এ বছরের ঈদ একেবারে আনন্দহীন। অন্য রকম।

আর পাঁচটা দিনের মতোই মিলনবিহীন এক সাধারণ দিন। ঈদ অর্থ আনন্দ। ঈদ অর্থ খুশি। প্রতিবছর ঈদ কে কেন্দ্র করে দেশে দেশে এক অনাবিল আনন্দ আবর্তিত হয়। একমাস সিয়াম সাধনার পর যাকাত, ফিতরা, দান, ধ্যান, কেনাকাটা, পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমে মানুষ পরিপূর্ণভাবে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে। প্রতিবছর ঈদের সকালে আতর, সুবাস, নতুন পোশাক, ফিরনি, সেমাই, ঈদের নামাজ, কোলাকুলি, পোলাও, কোরমা আর সারাদিনের ফিরিস্তি নাই বা বলি! কিন্তু এবার? রোজার আগে থেকেই শুরু হয়েছে কোভিড নাইনটিন, করোনা ভাইরাস, মৃত্যূ ভয়। বিশ্বজুড়ে কঠিণ মহামারির বিভীষিকাময় এক আতংক। মানুষ স্বেচ্ছায় ঘরে বন্দি। সারা বিশ্ব লকডাউন। সেই সতের মার্চ শেষ কলেজ করেছি। দফায় দফায় বেড়েছে দেশের সাধারণ ছুটি সহ আতংক এবং মৃত্যুহার। এবারের রোজায় প্রতিদিন নিয়ম করে আর কিছু না হলেও বেলা আড়াইটায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বুলেটিন নিয়ম করে দেখেছি, হিসাব রেখেছি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এবং প্রতিদিন যোগ হওয়া নতুন মৃত্যু তালিকা। আজ কী বার, কত রোজা, কত তারিখ সে সব কারো মনে না থাকলেও আজ দেশে নতুন করে কতজন আক্রান্ত হয়েছে, কতজন মৃত্যু বরণ করেছে করোনায়, তার মধ্যে কত জন পুরুষ আর কতজন মহিলা, তাদের বয়সের কোঠায় কে কোন অবস্থানে, এই সবকিছু আমাদের মুখস্থ থেকেছে এবং করোনার এততম দিনে আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায় তার তুলনা করতে করতেই দিনের পর দিন আমরা ব্যস্ত থেকেছি। নিয়ম করে অভ্যাস বশত পবিত্র কোরআন শরীফ এক খতম দিয়েছি ঠিকই, কিন্তু তার তাফসির, ব্যাখ্যা করার মতো সময় এবং মনোনিবেশ কোনটাই সঠিক ভাবে করতে পারিনি। এই রোজায় আমাদেরকে ঘরের প্রতিটি কাজ নিজহাতে করতে হয়েছে। এবার নিশ্চয়ই সকলে বুঝে গেছি, ঘরে ঘরে গৃহকর্মীর গুরুত্ব কতো? মাস গেলে তাকে ঠিকই টাকা পেমেন্ট করছি, বাড়তি দিচ্ছি প্রতি মাসেই। প্রয়োজনে একটু পাশের দোকানে পাঠালেও রিকশা ভাড়া হিসাব করে এবং নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে নিজের দায়বদ্ধতায় অধিক হারে কৃত দ্রব্যাদির সাথে সাথে পেমেন্ট করছি নগদ অর্থও। তাদের তো কাজ করতে অসুবিধা নেই, কাজ করতে এক পায়ে খাড়া। আমরাই আমাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে ছুটা গৃহকর্মীকে ঘরের ভেতরে ঢুকাচ্ছিনা। প্রতিদিন নিয়ম করে ময়লা ফেলতে আসে। সিঁড়ি পরিষ্কার করে, আঙিনা ঝাড়ু দেয়। বাইরের টুকটাক কাজ করে। কিন্তু ভেতরের রান্নাসহ সমস্ত কাজ নিজেরাই এ রোজায় করেছি। এ বছর রোজা আমাদেরকে কৃচ্ছতা সাধনার পাশাপাশি কর্মঠ হতেও শিখিয়েছে। কিছুটা হলেও শিখিয়েছে তাদের প্রতি আমাদের মমতা ও কৃতজ্ঞতা বোধ । এবার তারাও বুঝেছে, পাঁচ কেজি চাল, এক কেজি ডাল আর দুই কেজি আলুর জন্য এই গরমে রোজা থেকে কতটা পথ হাঁটতে হয়, কতবার মাস্ক বাঁধতে হয় আর কতবার পুলিশের দাবড়ানি খেতে হয়। তাই তারাও গার্মেনটস কর্মীদের মতো খুবই আন্তরিক, মাস গেলেই নগদ টাকার নিজেদের চাকরিটা বাঁচাবার জন্য। প্রতিদিনই তারা আসে, অথচ আকাঙ্খিত তাদের দেখে খুশি না হয়ে তিন হাত দূরে থাকি করোনার ভয়ে। আমার কাজের চাচী বিশ রোজার পর থেকেই প্রতিদিন সকালে এসে আমাকে জোর জবরদস্তি করে জানালা, দরজার পর্দা, সোফার কাভার, বিছানার চাদর, কাপড় চোপড় ভিজিয়ে দাও, আমি ছাদে নিয়ে কেচে দেবো। নাছোড়বান্দা। অথচ অন্য বছর তার সময় থাকে না, আমাকে নাছোড়বান্দা হতে হয়। সে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতো দু পয়সা বাড়তি রোজগারের জন্য। এবার অন্তত এগুলো না করলে তার বাড়ির সবার জন্য ঈদ বোনাস আশা করে কিভাবে? তাই তার এই জবরদস্তি! তবুও ভালো লাগে। ঈদ ঈদ মনে হয়! এবারের ঈদে আমাদের জন্য কোনো কেনাকাটা নেই। ছেলেটা ইউনিভার্সিটি ছুটি হলেই অল্প কাপড়ে চলে আসছিলো বাড়িতে। জানতো না তো, দফায় দফায় এতটা দিন ছুটি বাড়তে পারে। তাকে কতবার বলছি, অনলাইনে দেখো। তার এক কথা, –না মা, দরকার নেই। সে অনলাইনে ক্লাস, প্রেজেন্টেশান নিয়ে ব্যস্ত। ফাইনাল এগজাম কিভাবে হবে, সেইসব এসাইনমেন্ট নিয়ে তার দিন কেটে যায়। কেনাকাটায় কোন মন নেই। মেয়েদের কে জিজ্ঞেস করতেই –না মা পাঠিয়ো না। আমাদের লাগবে না। এবার আমাদের বাজেটগুলো বিলিয়ে দাও। তবে আমি সব সময় আমার নিজের খুশি তালাস করি। আমার মনকে খুশি করতে পারলেই আমি খুশি হয়ে যাই। বিবেককে খুশি করতে পারলেই আমি খুশি হয়ে যাই। সংগঠনের পক্ষ থেকে, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে যতটুকু সামর্থ্যের মধ্যে পেরেছি, দিয়েছি। দিতে তো অনেক ইচ্ছে করে কিন্তু সামর্থ্যের ব্যাপারটি থেকেই যায়। সেভাবেই আত্মীয় স্বজন যে যেখানে আছেন সকলকেই একটু একটু দিতে চেষ্টা করি। নিজেও নিজের জন্য কেনাকাটা করি। মেয়ে জামাই, ভাইবোন, আত্মীয় স্বজনেরাও আমাকে পাঠায়। কিন্তু এবারের ঈদ সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিজেদের জন্য কেনাকাটার কথা একটি বারের জন্যও মাথায় আসছে না। করি নি। এই করোনা কালীন মহামারিতে দেশের নতুন দুর্যোগ স্মরণকালের ভয়াবহ “আম্পান” জনজীবনকে এক বিরাট ক্ষতির মধ্যে ফেলেছে। কিছু মানুষের মৃত্যু এবং কিছু কিছু এলাকায় ব্যাপক ক্ষতিসহ হতাহতের সম্মুখীন হয়েছে দেশ। ফসলের ক্ষতি, ফলসহ ফলজ বৃক্ষ, কাঁচা ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এই দুর্যোগে, এই মহামারিতে ঈদ আবার কি? যারা অসহায়, কর্মহীন মানুষ, তাদের দিকেই খেয়াল রেখেছি, যতটুকু পারি। এই আমার আনন্দ। ঈদের আনন্দ। এবার করোনার কারণে মেয়েরা কেউ আসবে না। মেয়ে জামাই, নাতি, নাতনি, দেবর, জা আসবে না, কিন্তু ঈদ আসবে তা তো কোনদিন কল্পনাও করতে পারি নি। এবারের ঈদ হবার কথা ছিল অন্য রকম, আমাদের পরিবারের নতুন অতিথি আগমনের ঈদ! আহা! আমার ঈদের চাঁদ সব সময় একটু আগেই ওঠে। আপনারা জেনেছেন, যখন থেকে আমার আম্মুরা আসতে শুরু করে, তখন থেকেই আমার ঘরে ঈদের চাঁদ ওঠে। শাওয়ালের চাঁদের জন্য আমার ঈদের চাঁদ অপেক্ষা করে না, অথচ এ বছর পশ্চিমাকাশে শাওয়ালের চাঁদ উঠবে, কিন্তু আমার ঈদের চাঁদ উঠবে না ঘরে। এবার খোলা ময়দানে ঈদের নামাজ হবে না। হবে না কোলাকুলি। সালাম, সালামী! তাহলে আর ঈদ কী? তারপরও প্রকৃতির নিয়মে ঈদ আসবে, ঈদ যাবে। এটাই নিয়ম। এই নিয়ম মেনে নিয়েই ধৈর্য ধরতে হবে এবং প্রার্থনা করতে হবে, যেন মহান আল্লাহ্ পৃথিবী থেকে অতিশীঘ্রই মহামারী দূর করে পৃথিবীকে শান্ত, নির্মল এবং করোনামুক্ত এক শান্তিময় পৃথিবীতে মানুষের পরিপূর্ণ ঈদের আনন্দ ফিরিয়ে দিন। পৃথিবীতে সবার সাথে সবার মিলনের ঈদ হোক, শান্তির ঈদ হোক, আনন্দের ঈদ হোক আবারও– সে আকাঙ্ক্ষা নিরন্তর।