”যত পড়ে তত জানে, যত জানে তত কম মানে” : কাজী বর্ণ উত্তম

”যত পড়ে তত জানে, যত জানে তত কম মানে" : কাজী বর্ণ উত্তম । টাইম ভিশন ২৪

”যত পড়ে তত জানে,
যত জানে তত কম মানে”
কাজী বর্ণ উত্তম

বহু বছর আগে আমি তখন সবে স্কুল শেষ করেছি সম্ভাবত, আমার উপর দ্বায়িত্ব পড়লো মহিলা পরিষদ নেত্রী ডাঃ রত্না কে যশোরের বাগাছড়াতে মহিলা পরিষদের মিটিং এ নিয়ে যাওয়ার এবং আশার। উনি বক্তব্যের মধ্যে বললেন “নারীরাই নারীদের শত্রু ” কথা টি আজও কানে লেগে আছে। আজ কয়দিন ফেসবুক বা ম্যাসেঞ্জারে একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল যেখানে এক মহিলা বলছে তিনি আর তার স্বামী এক আত্মীয় কে দেখতে ঢাকার এ্যাপলো হাসপাতালে গেছে। কোন এক সময় রুগির স্ত্রী – শ্বাশুড়ি আর তারা হাসপাতালের ক্যাফেতে এসেছে এবং খাবার অডার দিয়েছে। খাবার গুলো পরিবেশনের সময় রুগির স্ত্রী একটু উঠে গেছে, সেই ফাকে রুগির মা পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুসারে কম কথা বলেন, তিনি বলছেন মহিলা টা কে কিছু খাবার প্যাক করে দিতে ঐ খাবার থেকে, স্বাভাবিক ভাবেই মহিলা বললো আপনার বৌমা কে বলেন তিনি এক্সট্রা অর্ডার করে দিবে এবং জানতে চাইলো কার জন্য, শ্বাশুড়ি আস্তে আস্তে বললো তার স্বামীর জন্য। এবং সে বৌমা কে বলতে নিষেধ করলো। এরই মধ্যে বৌমা এসে বললো কিছু খাবার বাসায় নেব বলে অডার করতে গিয়েছিলো। মহিলা উৎসুক হয়ে প্রশ্ন করলো কার জন্য -উত্তরে বৌমা বললো বাসায় তার মা এবং দুই ছেলে মেয়ে আছে, শ্বশুরের কথা বললো না…….।

পিতার বাবা বা দাদা যিনি এক সময় ছিলেন পরিবারের কর্তা এবং তিনি বটবৃক্ষের ন্যায় পুরো পরিবারকে ছায়া দিয়ে রাখতেন। জীবন সংসারের বেশীর ভাগ বিষয়ে তার মতামত প্রাধান্য ছিল এবং তার সিদ্ধান্তেই সংসার পরিচালিত হতো। এই কর্তার স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে ও নাতি-নাতনি ছিলেন গল্পের মত অনন্য অসাধারণ চরিত্র। কর্তার স্ত্রী অর্থাৎ দাদী ছিলেন সংসারের কর্ত্রী। সংসার দেখাশোনা ও রান্নাবান্নার দায়িত্ব ছিল। নাতি-নাতনীরা দাদীর কাছেই বড় হতো। দাদী ছিল তাদের গল্পবুড়ি- মজার মজার ভূতের গল্প, রাক্ষস আর খোক্ষসের গল্প শুনেই বড় হতো এক সময় যৌথ পরিবারের সন্তানেরা। প্রতিটি পরিবার ছিল ভালোবাসার সুতোয় গাঁথা। তবে এগুলো সবই রূপকথা হয়ে যাচ্ছে কি? । ধীরে ধীরে আজ আমরা সেই বটবৃক্ষের ছায়া থেকে অনেক দূরে।

জীবনসংসার এখন চাকচিক্য আছে কিন্তু আবেগ যেন আগের মত নেই । একটি ছোট ফ্ল্যাট , ছোটসংসার, ছোটপরিবার, যেখানে বসবাস করে কেবলমাত্র মা-বাবা আর তাদের এক বা দুটি ছেলে-মেয়ে। এখনকার জীবনে আনন্দ যার যার যন্ত্র-মনন্তরে(মোবাইল, ট্যাব ইত্যাদি ), সবই যন্ত্রের মতো, একই ছাদের নিচে নিঃসঙ্গ জীবন। পূর্বের সেই একান্নবর্তী পরিবারে যারা কর্তা-কর্ত্রীর ভূমিকা পালন করতেন, বর্তমান একক পরিবারে তাদের উপস্থিতি মেহমানের মত। ওদের মধ্যে দাদা-দাদী, চাচা-ফুপু, নানা-নানী, মামা-খালার প্রতি কোনো ভালেবাসা, শ্রদ্ধাবোধ বা সহনশীলতা কেন জানি আগের মত গড়ে উঠছে না। এর মূলে রয়েছে কি আধুনিক- প্রযুক্তি -সভ্যতা-যান্ত্রিক জীবন।

টাকা পয়সার সাথে সাথে সন্তান গুলো বিবাহের পরে বাবা-মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুজনের একক পরিবার গড়ে তুলছে এমন কি একটি সন্তান হলেও। বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে নিজেরা আলাদা থাকতেই আজ তারা বেশি স্বাছন্দ্য বোধ করে। এছাড়াও বর্তমান সমাজের আত্মকেন্দ্রিক ও অসহযোগিতার চর্চা তার জন্যও খানিকটা দায়ী কি? । শিশুরা শিশু বয়স থেকে একলা থাকতে থাকতে জন্মাচ্ছে কি স্বার্থপরতা, জানেনা ভাগাভাগির আনন্দ, ত্যাগের মহত্ব। হয়ে উঠছে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারী মানুষিকতার, কেন জানি মনে হচ্ছে গড়ে উঠছে না কোনো হিতাহিত বোধ বা শিষ্টাচার শিক্ষা, যা আগামীর ভবিষ্যত অন্ধকার করে দিচ্ছে কি না কে জানে।

”যত পড়ে তত জানে, যত জানে তত কম মানে” হীরক রাজার দেশেতে সত্যজীৎ রায়ের ব্যাঙ্গ বক্তব্য টি আজ সত্য মনে হচ্ছে। তবে এ জানা শুধু বিদ্যার্জন হচ্ছে বড় বড় ডিগ্রি হচ্ছে জ্ঞান হচ্ছে না, এ যেন মোমবাতির আলোর ছায়ার মত। আলো তৈরি না হয়ে ছায়া তৈরি হচ্ছে। প্রাচীন বাংলায় বড় বড় ডিগ্রি ধারী ছিল না তবে ছিল পারিবারিক ঐতিহ্য যা মানুষ কে স্বশিক্ষিত করে তুলতো। আজকের বাংলায় পারিবারিক সেই শিক্ষা হারিয়ে যাচ্ছে কি?