ছোট গল্প : কুসুমের চিঠি” : আব্দুছ ছালাম চৌধুরী

ছোট গল্প : কুসুমের চিঠি" : আব্দুছ ছালাম চৌধুরী । টাইম ভিশন ২৪

কুসুমের চিঠি”
আব্দুছ ছালাম চৌধুরী

প্রিয় কুসুম,
কেমন আছো,গেলো বর্ষা মৌসুমের পর আর তোমার সাথে দেখা হলো না। গত পরশু, আমাদের বাড়িতে ফুফা এসেছিলেন। মা’র সাথে অনেকক্ষণ গাল গপ্পো করেছেন। যাবার বেলা পথেই আমার সঙ্গে দেখা হলো। বলে গেলেন এই বর্ষা শেষেই মা’কে নিয়ে তোমাদের বাড়ি যাবেন ।তুমি হয়তো সেই ফুফাকে ভুলেই গেছো,
মনে আছে ঐ যে ঐ কুশিয়ারা নদীর তীরের যে মধুপুর গ্রাম,সেই গ্রামের বাসিন্দা মনে আছে? আগের বর্ষায় তুমি তো ঐ নদী দিয়েই গিয়েছিলে,ঐ যে তোমাদের মালেক চাচার বর যাত্রায়। মনে আছে? ঐদিন আমি ঐ ঘাটে নামাতে হঠাৎ আমি যে তোমাকে চোখ টিপ্পনী দিয়েই গিয়েছিলাম। মূলতঃ তো সেইদিন থেকেই আমাদের প্রণয় শুরু হয়েছিল। মনে পড়ছে?  আরে হালকা পাতলা লম্বাটে ফুফা। মনে পড়ছে না ? আচ্ছা থাক্,আবার যখন দেখা হবে তখন তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেবো। আর মূলতঃ এই ফুফা-ই তোমার কথা মা’কে বলেছেন, আর সেই থেকে আমাদের মাঝখানে ফুফার আগমন। বাদ দাও,সময় মতো তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেবো। এবার বল, তুমি কেমন আছো, অনেকদিন হলো তোমার চিঠি পাইনি। অন্তত চিঠির প্রাপ্তিতার খবর সঙ্গে সঙ্গে জানিয়ে দিও। আরে বাবা পেয়েছি, এই মর্মে পোস্ট কার্ডে কিছু লিখে দিও। প্রয়োজনে বিয়ারিং পোস্ট করিও। ইদানিং আমার কিছুই ভালো লাগছে না, জানি না এই বর্ষা এতো লম্বা কেনো, গেলো চার পাঁচটি বর্ষা আসতো আর চলে যেতো। তেমন টেরই পেতাম না। আমাদের অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে সবাই অলস থাকে। কাজ কর্ম নেই বললেই চলে। রাতভর কেচ্ছা কাহানী চলে, এবং জারি সারি গান হয়। এ বাড়ির পর ও বাড়ি ঠিকমতো ঘুমাতেই দেয় না। কিন্তু এই বর্ষা সেই যে চৈত্র মাসের শেষের দিক থেকে শুরু হলো আর যাবার নামই নিচ্ছে না।
তোমার বিষয়ে সবার জানাজানি আছেই। এখন শুধু দিনক্ষণের অপেক্ষায়। পাশের বাড়ির ভাবিকে দিয়ে মা’র সঙ্গে কথাবার্তা ও আগাইয়া রেখেছি। এইবার মা ও রাজি। মা’র শরীরে আর কুলায় না, হাতে পায়ে বিষ ব্যথা তো ছিলো এখন আমার নতুন করে কোমরে ব্যথা পাইছেন। এই তো সেদিন ঘাটে জল আনতে ধপাস করে পড়ে গেলেন, সেই থেকে বিছানায়’ই আছেন। ফক্কড়ের বউ এসে রান্নাবান্না করে দেয়। মা’র ও সেবাযত্ন করে। আমার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কিছুই করতে পারছি না। নিজ থেকে মা’কে আর কিছু বলতে পারছি না। বেশ কিছুদিন হলো ফুফা ও আসছেন না।
তোমার খবর বল, আমি সবই বুঝি, কিন্তু লজ্জায় কিছু বলতে পারছি না। নতুবা এই বর্ষাই নৌকা নিয়ে রওয়ানা দিতাম। আর নৌকা’ই তো ভালো সুবিধা। সময় একটু বেশী লাগলেও আমার ঘাটে উঠতাম আর কুশিয়ারা নদী দিয়ে বেয়ে ঐ হাওরের পথ দিয়ে তোমাদের কুসুম গাঙে উঠতাম। অবশ্য আমার যাত্রা একা হবে না, মধুপুরে উঠে ফুফা’কে সঙ্গে নিয়ে তোমাদের বাড়িতে যাবো। এ যাত্রা তুমি যদি বল, তাহলে দিনক্ষণ ও আগানো যেতো। তোমাদের ওখানের অবস্থা আমি তো জানি না।
কি করবো বল, তুমি যদি বলো,তবে ফুফা’কে আনতে খবর পাঠাই। আমাদের গোলাম আলী এক্কেবারে বেকার। বর্ষায় মাছ ধরা ছাড়া তেমন কাজ নেই। সংসার ছোট থাকায় একদিন মাছ ধরলে তিন চারদিন খেতে পারে। এদিকে দিয়ে যেতে যখন আমাকে দেখে,শুধু শুধু খোঁচাখুঁচি দিয়ে দুই চারটা কথা শোনায়ে যায়।
কিছুদিন হলো কারণে অকারণে এমনি এমনি সন্ধ্যা পরে এসে বকবক করে যায়। আমার আর অত্তো সব বকবকানি শুনতে ভালো লাগে না। আমি চাই তোমার সাথে এই শ্রাবণে একটু বৃষ্টিতে ভিজতে। বারান্দায় বসে দু’গাল মিঠা মিঠা কথা বলতে।
তুমি যদি রাজি থাকো, তাহলে এই বর্ষায়-ই তোমাকে বঁধু রূপে বরণ করি।
কি বলো? কি করবো, তাড়াতাড়ি জানাইও। মা’র দুঃখ সহ্য হচ্ছে না।
উত্তরটা দিও, এবং খুব তাড়াতাড়ি দিও।দুইদিন পর হাট বসবে। তোমার চিঠির খোঁজে আমি নিজেই পোস্ট অফিসে যাবো। দুই হাট খোঁজ করার পর হতাশ হলাম, মনে মনে ভাবলাম এই বর্ষা মৌসুমে বোধহয় বিয়েটা হবে না। মনমরা হয়ে এখানে ওখানে বসে সময় পার করছি।একদিকে চিঠি নেই, অন্যদিকে ফুফা ও আসছেন না। এমতাবস্থায় একদিন হঠাৎ গোলাম আলীর সঙ্গে দেখা হলো, ঐ ডাইকের হাটে। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বললো মা ডাকছেন। বাড়িতে ফুফাও এসেছেন। ইতস্তত করে মাথার গামছাটা কোমরে বেঁধে বাড়িতে গেলাম। যেতেই, কারো মুখে কোনো কথা শুনতে পেলাম না। টের পেলাম, কি একটা হয়েছে, নতুবা ফিসফিস করে কিসব আলোচনা চলছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর ফুফা হ্যাঁ করে তাকায়ে বললেন, চিঠি এসেছে। চিঠি শব্দ শুনেই আমার ঠোঁটে মুখে হাসির ফোয়ারা যেনো থামছে না।
যাক উত্তর এসেছে। তিন হাট পরে হলেও উত্তর এসেছে। দুই দিন আগে পত্র পাওয়ার পর, মা-ও বড় বাড়ির বড় ফুফা’কে খবর দিয়ে বাড়িতেই এনে রেখেছিন। তাহলে না আগে টের পেয়েছেন, এই সব কথা আমি মনে মনে ভাবছি, তবে আমার ভাবনা যাহাই থাকুক আজকের চিঠি কেউ মুখ খোলছেন না এবং কিছু বলেছেন ও না। চিঠি দেখি মা বলতেই মা জবাব দিলেন না, তোমার দেখার দরকার নেই। তারপর ও দাঁড়িয়ে থাকায় আমতা আমতা কণ্ঠে বললেন এটি কুসুমের চিঠি নয়, চিঠি’টা এসেছে কুসুমের বাবার কাছ থেকে। মা এবং ফুফা হালকা পাতলা আগেই পড়ে নেয়াতে কালো মুখে বসে আছেন। তারপর ও মা সরাসরি কিছুই বলছেন না। কিন্তু ফুফা ইতস্তত করছেন। ফুফার অক্ষর জ্ঞান তেমন না থাকায় বললেন চিঠি’টা আবার পড়ে দিতে। মা একটু রাগ করে বললেন, থাক্ পড়তে হবে না। ওদিকে ফুফা নাছোড়বান্দা, তেমন বিশ্বাস না হওয়ায় মা’কে ঝাড়ি দিয়ে বললেন, কি লিখছে পরিস্কার বলবেন তো।  চুপচাপ থাকলে আমি কি বুঝবো। ফুফার চাপাচাপিতে এবং আমার আগ্রহে চিঠি খানা এবার আমি পড়লাম। চিঠিতে লেখা, আমাকে ক্ষমা করবেন। ইউরোপের একটি সম্মন্ধ পাওয়ায় আপনাদের সাথে বিয়ে দিতে পারছি না। পড়েই তো আমার মেজাজ খারাপ। আজ কাল করে করে তিন তিনটা বর্ষা চলে গেলো, দিনক্ষণ ঠিক হয়েই হচ্ছে না। হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পারায়, নিজ থেকেই রাগান্বিত হলাম। ফুফাকে বললাম এর মানে কি?কিছুক্ষণ বারান্দায় এপাশ ওপাশ করতে করতে হঠাৎ ফুফা বলে উঠলেন চল-চল মানে?
কোথায়? ডাক তোর সঙ্গী সাথীকে, আজই রওয়ানা দেবো। একটা গুমটি নাও লও। আমি বলি, কি বলছেন ফুফা। ইউরোপীয় স্বামী পেয়ে সে-ও তো (কুসুম)সুখী হবে। আর তার সম্মতি হয়তো আছে বলেই তো এই চিঠি।  ফুফা খুব রাগী মানুষ, যা বলছেন তাই না করলে কার মাথা ফাটাবে কিংবা বকাঝকা করবে আল্লাহ-ই জানেন।
কিছুক্ষণ পরে মা ও ঘরের বাহিরে এসে বললেন, যা। তোর ফুফার সাথে যা। তিন বছর আগে সম্মন্ধ পাকাপোক্ত করে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছি না।
তখন দুপুর গড়িয়েছে- এবার আমি বাঁকা মুখে আঙিনার ঐ কোণে বসে রইলাম।
ফুফা আমাকে ডাক দিয়ে বললেন, শোন আজই রওয়ানা দেবো এবং যতই রাত হোক, ওখানে যাবোই যাবো। আমি বললাম না, এ হয় না। ফুফা ধমক দিয়ে বললেন চুপ থাক্ বেটা, এটা কি মগের মুল্লুক।  তুই যাবে কি না বল? কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বললাম, ঠিক আছে যাবো, তবে একটা শর্ত আছে। ফুফা আবারও ধমক দিয়ে বললেন আচ্ছা বল, কি শর্ত? আমি মাথা নিচু করে বললাম, আমি কুসুম’কে নিজে জিজ্ঞেস করবো, তার যদি মতামত থাকে (ইউরোপ) তাহলে ঐ রাতেই কিছু না খেয়ে ঐ বাড়ি থেকে চলে আসবো।  একটু ইতস্তত করেও আমার কথায় ফুফা রাজি হলেন। তাৎক্ষণিক মা এসে বললেন যদি আমার কুসুম রাজি থাকে আজই বউ করে আনবে। আর, এই আমি এখানে বসলাম, তোমাদের না আসা পর্যন্ত এখান থেকে এক পা নড়ছি না।  বিসমিল্লাহ বলে রওয়ানা দিলাম। যাবার সময় মা’ দুটি বালা এবং সোনার কিছু গহনা দিয়ে বললেন। তোর নিজ হাতে পরিয়ে দিস। বাদ জোহর রওয়ানা দিয়ে নদী নালা খাল বিল পাড়ি দিয়ে সেই কুসুম নদীতে যখন নাও উঠলো। তখন অনেক রাত, পাখপাখালির কিছু গুঞ্জন ছাড়া তেমন কিছু শোনা যাচ্ছে না।
ফুফা একটু গলা কেসে হাক ডাক দিয়েই কুলসুমের বাবাকে ডেকে তুললেন। তেমন অভ্যর্থনা না জানালেও, ভারি কণ্ঠে এতো রাতের আগমনের কারণ জানতে দ্বিধা করেন’নি। এরইমধ্যে পিছন থেকে আওয়াজ এলো, বাংলা ঘর খোলে দিতে। আগে তাদের নিয়ে বসো,তারপর আলাপ আলোচনা করবেন।  কথামতো কুসুমের ছোট ভাই এসে দুয়ার খুলে বসতে বললো। এরই মাঝে ফুফা কুসুমের বাবার সঙ্গে হাত পা ধুঁইতে পুকুর ঘাটে চলে গেলেন। আর আমি ঐ বাংলা ঘরে একা বসে আছি। কিছুক্ষণ পর কুসুমের মা এসে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে বড় ঘরে নিয়ে গেলেন। ওখানে জলপান সহ আরও কিছু কথা হলো। একপর্যায়ে তিনি সেচ্ছায় কানে কানে বলে দিলেন। কুসুমের বাবা কিছুটা লোভী, ইউরোপে নাম শুনে আমার কুসুম কে বিয়ে দিতে চাইছে। আমার কিংবা কুসুম কারোর-ই এই বিয়েতে সম্মতি নেই। মনে মনে ভাবছিলাম,কুসুমের কথা বলবো, এদিক ওদিক থাকানো শেষ হতে না হতেই স্বয়ং কুসুম হাজির হলো। ইশারায় তাকে আমি স্বাগত জানাইলাম।তারপর চোখ পড়লো ঐ দুয়ারের দিকে, দেখি (C vita) শরবতের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এবং নিজেই হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা আমার দিকে দিলো, গ্লাসটা হাতে নেবার সময় জরুরি কথা আছে বলে ইশারা দিলাম। কুসুম ও আমাকে দেখে বললো, তাড়াতাড়ি বলুন, মা আসবে। বললাম সমস্যা নেইযা শুনেছি তা কি সত্যি? উত্তরে আমাকে বললো, আল্লাহ কেনো আমাদের নারী রূপে সৃষ্টি করলেন। আমাদের কিছু বলার থাকে না।আমি বললাম তুমি কি চাও? তাই বল। বললাম তো, আমি চাইলেই কি হবে?বললাম হবে
নিশ্চয়ই হবে।কুসুম বললো, দেখো গত তিনবছর ধরে এই একই কথা শুনছি–
আমি বললাম কি বলো, তোমার বাবা-ই তো আজ কাল করে করে এতদিন পার করে দিলেন। এই তো ছয় মাস আগেই বলেছিলেন বর্ষায় বিয়ে হবে
তারপর এই চিঠি – নাও তুমি পড়ে নাও। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর কুসুম বললো, তুমি কি আমার কথা শুনবে।  আমি বললাম, আমি তো তোমার কথা শুনতে নিজেই এসেছি। এই কথা শেষ হতে না হতেই, কুসুমের মা হাজির- আমাকে বললেন, মেয়েটার দুঃখ সইতে পারছি না।আমি বললাম আপনি কি চান?
ঠিক সেই মুহুর্তে কুসুম বললো, তুমি কি আজ এক্ষুনি আমাকে বিয়ে করবে? মৃদুস্বরে হেসে পকেটে হাত দিয়ে মা’র দেওয়া হাতের বালা এবং গহনাদি কুসুমের হাতে তুলে দিলাম। এরই মধ্যে ফুফা এবং কুসুমের বাবা বারান্দায় এসে হাজির হলেন। তারা দুজনেই এখানেও আসার আগে হুহ্ হুহ্ কাসি দিলেন।  তাদের কাসি শুনে ভেতরে থাকা মা মেয়ে এবং ছোট ভাই একসাথে হেসে উঠলেন।
সমাপ্ত

লেখক পরিচিতি-
আব্দুছ ছালাম চৌধুরী
পিতা -আব্দুছ ছোবহান চৌধুরী
গ্রাম -মধুরাই
থানা -বালাগঞ্জ
জেলা- সিলেট
স্থায়ী বসবাস ইংল্যান্ড