যশোরে স্বল্প পরিসরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা : জনজীবনের ঝুঁকি ও আক্রান্ত বৃদ্ধির কথা বললেন নেতৃবৃন্দ

যশোরে স্বল্প পরিসরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা : জনজীবনের ঝুঁকি ও আক্রান্ত বৃদ্ধির কথা বললেন নেতৃবৃন্দ। টাইম ভিশন ২৪

মো: শরিফুল ইসলাম : মানুষের জরুরি প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক শ্রমিকদের কথা চিন্তা করে সরকার গত ১০ মে থেকে সারাদেশে সীমিত পরিসরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর সারাদেশে ব্যবসায়ীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার কিন্তু শেষ পর্যন্ত শ্রমিক-কর্মচারীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশংকায় রাজধানীর অধিকাংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল না খোলার সিদ্ধান্ত নেন ব্যবসায়ীরা। এর পরপরই চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার।
খুলনা বিভাগের প্রাচীন ও বৃহৎ জেলা শহর যশোরের ব্যবসায়ীরা গত ৯ মে সার্কিট হাউসে প্রশাসনের সাথে সভা করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে। যে সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আরিফ। সভায় সিদ্ধান্ত হয় সরকারি ঘোষণা অনুযায়ি ১০ মে থেকে স্বল্প পরিসরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার। এ ক্ষেত্রে সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি পালনের। যার ফলশ্রুতিতে গত ১০ মে থেকে যশোরে সকল প্রকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা হয়।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার পরিপ্রেক্ষিতে জেলার করোনা পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে কথা হয় যশোরের রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দের সাথে।

জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম বলেন, সরকাকার অথনৈতিক দিক বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেয়। আমারা মনেকরি সরকারের এই সিদ্ধান্ত এটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত।
তাই আমাদের বক্তব্য হচ্ছে সরকারের এই মুহুর্তে এই সিদ্ধান্ত নেয়া একেবারে উচিৎ হয়নি। আর কিছুদিন লকডাউন রেখে পরিস্থিতি সাভাবিক হওয়ার পর এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ ছিল।

বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টি (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বলেন সরকার যখন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি খুলে দেয় তখনও আমরা বারবার সরকারকে এমন একটি সিদ্ধন্ত নিতে বাধঁ সেধে ছিলাম। আমরা বলেছি এমন সিদ্ধন্তে শৃঙ্খলা ব্যাহত হবে সংক্রমন আরো বেড়ে যাবে। আমাদের যেমন অর্থের প্রয়োজন আছে তাঁর আগে আমাদের জীবনের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে।
আমার মনে হয় শপিং কমপ্লেক্স খোলা রেখে সরকার একটি দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। আজকে যশোরের চিত্র দেখে মনে হচ্ছে করোনার সংক্রমন আরো বেড়ে সাধারণ মানুষ নিশ্চিৎ বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি আমাদের কে বলেন একদিন মার্কেট খুলেছে এর মধ্যেই সংক্রমন বেড়ে ৮৮৭ থেকে ১১২৬ এভাবে যদি আরো কিছুদিন চলতে থাকে তাহলে সধারণ মানুষ আরো ঝুকির মধ্যে চলে যাবে। ঢাকা,চট্রগ্রাম,ও সিলেট এর ব্যাবসয়িদের ধন্যবাদ জানায় যে তারা সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধন্ত নিয়েছে।
তিনি সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান এই আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে প্রত্যার করতে।

যশোর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এ্যাড. জহুররুল হক বলেন, সারা বাংলাদেশের ব্যাবসায়িক প্রাণকেন্দ্র আমাদের যশোর। সরকার ক্ষুদ্র ব্যাবসায়িদের কথা চিন্তা করে সল্প পরিসরে ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। কারন ব্যাসা বন্ধ থাকলে দোকান বন্ধ থাকলে ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ি সহ তাদের কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
একদিকে অর্থনিতি অন্য দিকে জিবন, তাই আমি যশোরের বাশির উদ্দেশ্যে বলতে চায় সরকার আমাদের কথা চিন্তা করে সরকার সল্প পরিসরে দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছেন। আমাদেরও আমাদের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আলহাজ মিজানুর রহমান খান বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল মানবিক কারণে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানসহ মানুষের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে স্বল্প পরিসরে দোকান খোলার। কিন্তু যশোরের বাজারসমূহ ঘুরে দেখা যাচ্ছে মানুষের প্রচন্ড ভিড়। যা চিন্তার বিষয়। এ বিষয়ে এখনই নজর দেয়া প্রয়োজন। কেননা খুলনা বিভাগে যশোর এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। ঈদের বাজার বা অন্য কিছু নয় মানুষ অনেক দিন ধরে ঘরে একই সাথে ব্যবসায়ীরাও দোকান-পাট খুলতে পারেননি তাই জরুরি প্রয়োজন মেটানোর কথা ভেবে স্বল্প পরিসরে দোকান খোলার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু দেখা গেল শপিং মলই প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। কিন্তু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার পর দেখা যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রদত্ত বা প্রশাসনের দেয়া নির্দেশনা মেনে চলতে চাইলেও জনগণের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব, সামাজিক দূরত্ব এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়ে কোন আগ্রহ নেই। মানুষের মধ্যে এই সচেতনতা কিভাবে আনা সম্ভব। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরো কঠোর নজরদারি কামনা করেন এই ব্যবসায়ী নেতা। তিনি বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ বিষয়ে কাজ করছেন তিন্তু তারপরও আরো জোরদার করার আহবান জানান। অপর এক প্রশ্নের জবাবে এই নেতা বলেন, নির্দিষ্ট সময়ের পর যে সকল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খোলা রেখে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়ার কথাও বলেন তিনি। একই সাথে তিনি বলেন, আমরা যে যেখানে আছি সেখান থেকে সরকারের সাথে থেকে সকলে চেষ্টা করছি এই বিপদ থেকে দ্রুত রক্ষা পাওয়ার জন্য। কিন্তু জনগণের মধ্যে যে সচেতনতার অভাব তা দুঃখজনক। এভাবে চলতে থাকলে আমরা যে কবে এই বিপদ থেকে মুক্তি পাব তা আল্লাহ পাকই জানেন।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যশোর জেলা শাখার সভাপতি হারুণ অর রশিদ বলেন, যশোরে লকডাউন শিথিল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে বলেন যশোরের মানুষ কোনভাবেই লকডাউন মানছে না। সেটা দোকান খোলা বা বন্ধ রেখেও না। আমি মনে করি যশোরের মানুষকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। তিনি বলেন, সারাবিশ্বে যেখানে বয়স্করা মারা যাচ্ছে সেখানে আমাদের দেশে তরুণদের ভেতর মৃত্যুহার বেশি। এর কারণ তরুণ যুবকরা সচেতন নন। তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। এর ফলে মৃত্যুহারও বাড়ছে। তিনি আরো বলেন, মূলত তো আমাদের নিজেদেও দায়িত্ববান হওয়া সেটা হচ্ছে না বলেই আমাদেও এখানে সমস্যাটা বাড়ছে। এর সাথে দোকান পাট খুলে দিলে এটা আরো বাড়বে। এবং বাস্তবতা হলো মৃত্যু শুরু হলে কিন্তু ঠেকানো যাবে না। তাই আমে মনে করি দোকান-পাট এখনই খুলে না দিয়ে আরো কিছু দিন পর খুললে ভাল হতো।

যশোর শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান বুলু এ বিষয়ে বলেন, এটা সরকারের দ্বিমুখি নীতির বহিঃপ্রকাশ। একদিকে বলছে ঘরে থাকুন আবার ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে বলছেন মানবিকতার কথা। দিন যত যাচ্ছে টেস্ট করার সংখ্যা বাড়ার সাথে আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। এমনকি ২৪ ঘন্টায় দেশে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারও ছাড়িয়েছে। যশোরে কোন লকডাউন তুলে দেয়ার কোন ঘোষণা দেয়া না হলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র অফিস-আদালত ছাড়া আর সবকিছু খোলা। এটা আমাদের জন্য মোটেই ভাল হবে না। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে এখনও করোনার প্রকোপ ব্যাপক। তাই আমি মনে করি লকডাউন ঢিলেঢালা করা ঠিক হয়নি।