তিনজন নারীর চলমান জীবনের গল্প : মাহমুদা রিনি

তিনজন নারীর চলমান জীবনের গল্প
মাহমুদা রিনি

প্রথম দৃশ্য; দু’জন মধ্যবয়সী নারী নিজেদের মধ্যে কথা বলছেন। একজনের বয়স ষাটের উপরে, আরেকজনের পঞ্চাশের কাছাকাছি। গ্রাম্য জীবনের চির পরিচিত দৃশ্য। দুজনেই খুব ব্যস্ত, কাজের ফাঁকেই তাদের কথা বলা। এই দুজন নারীর কথা বলার বিষয় এক, তারা দু’জনই সংসারে একই ধরনের নির্যাতিত। নারীর প্রতি নির্যাতনের ধরণ সবক্ষেত্রে এক রকম হয় না, একেক সংসারে একেক রকম। এই দু’জনের দেখা বা চেনা জগতের ভিতর তাদের দৈনন্দিন কষ্ট ভোগের ধরনে অনেকটা মিল, সেটাই তারা বলছেন কার বেশি কার কম!
ষাটোর্ধ যিনি তার কথা একটু বলি, খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে এসেছেন। বর বাড়ির একমাত্র ছেলে। বাপের পরে তিনিই বাড়ির কর্তা। বাপও ছিলেন বেশ কড়া ধাতের মানুষ। বিষয়-আশয়ের বাইরে কিছু বুঝতেন না। বাড়ির বউ আর চাষের গরুর মধ্যে তেমন পার্থক্য করেননি শুধু গরুর দেখভাল যত্নআত্তি করতে হতো বউয়ের কিছুই করতে করতে হয় না সেটা বুঝতেন। যাইহোক বাপের গল্পে এখন আর না যাই, ছেলের গল্পে আসি। তিনি যা যখন বলেন তাই বাড়ির সবাইকে মানতে হয়। তিনি খাবার পর যা থাকে তাই বাড়ির সবাই খায়। এমনটাই এবাড়ির নিয়ম। চাষি গৃহস্থ পরিবারের বউ, ভোর থেকে রাত অব্দি খাটতে হয়। রান্না বান্না ঘরের কাজ ছাড়াও গরুর খাওয়ানো, বাধা, গোয়াল পরিষ্কার সহ কৃষি কাজের সাথে জড়িত হেন কাজ নেই যা তাকে করতে হয়েছে বা এখনো হয়। তার উপর কোন কাজের সময় একটু এদিকওদিক হলেই প্রায় প্রতিদিনই বেদম প্রহার– যেন নিত্য ভাত খাওয়ার মতই স্বাভাবিক ব্যাপার। উনার ভাষায় সে মার এখনকার মেয়ে বউরা খেতেই পারবে না। কখনো গরু তাড়ানো পেঁচোনি, কখনো চেলাকাঠ, কখনো আস্ত একখানা আখ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল। হাত পায়ের ব্যবহার তো নস্যি। তারপরও লাঠিসোঁটা ভেঙে যতই গুড়ো হোক শরীর একদণ্ড অবসরের উপায় নেই। পরক্ষণেই আবার কাজে লাগতে হবে সেই আগের নিয়মে। ব্যত্যয় হবার কোন সুযোগ কখনো হয়নি এখনো নেই।
এভাবেই সংসার, ছেলে মেয়ের জন্ম এবং বড় হওয়া আবার তাদেরও বিয়ে শাদী শেষ করেও আজো সেই একই নিয়মে চলে আসছে। শুধু এখন মারের জোর কমে যেয়ে মুখের জোর বেড়েছে। বয়স বেড়ে যাওয়ায় গৃহকর্তার মারতে এখন কষ্ট হয় কিন্তু খাবারের তদারকি আর গলার জোরে কে কোথায় কোন কাজে ফাঁকি দিচ্ছে সে সব এখনো তার নখদর্পনে। এক কেজি মাংসের কত টুকরো কয়বার তার পাতে পড়লো, মাছের কোন অংশটা তার ভাগে পড়েনি, হাঁড়ির তলায় দুধ বাকি আছে কিনা সে সব হিসেব তার ষোলআনা চায়। তা বাড়িতে ছেলেপুলে, মেয়ে-জামাই, আত্মীয়- কুটুম যেই থাক না কেন! ছেলেপুলেদেরও বেশি পাত্তা দেন না কোন কালেও। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেদেরও বিয়ে দিয়ে আলাদা করে দিয়েছেন, যে যার কর্ম করে খাও। মোটামুটি অবস্থাপন্ন হওয়া সত্বেও সবারই প্রায় দীনহীন অবস্থা।

দ্বিতীয় জন কিছুটা দমে যেয়েও এগিয়ে আসে। তার স্বামীও কম যায় না। মারের বেলায় একই রকম। লাঠিসোঁটা, খোন্তা কোদাল কিছুই বাদ যায় না। গালাগালি আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে। মা- বাপ, মা-বাপের চৌদ্দ গোষ্ঠির জীবিত, মৃত যারাই থাকুক সবাইকেই মোটামুটি—–! যাইহোক সবটা লিখে বোঝানো সম্ভব না।
তবে এ বাড়ির কর্তা মাইরের দিক দিয়ে সমান সমান হলেও ছেলে মেয়ে আত্মীয় পরিজনের সাথে মোটামুটি মানিয়ে চলতে পারেন। খাওয়া দাওয়া নিয়ে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করেন না। বউকে ছাড়া বাকিদের খাওয়াতেও পছন্দ করেন। সাধ্য অনুযায়ী বাজার ঘাটও করেন।
এই দুজনের গল্প এখানে রেখে আরেক দৃশ্য থেকে ঘুরে আসি।
ইনি বর্তমানে একজন শাশুড়ীর ভূমিকায়। বয়স ষাটোর্ধ। এসেছেন সম্পর্কে নানী হন একজন পৌঢ় মুরুব্বির সাথে দেখা করতে। সেখানে আরো কয়েকজন মহিলা আছেন। ইনি বাড়ি থেকেই ফুঁসতে ফুঁসতে এসেছেন। এখানে এসেই ভিতরের উত্তাপ উগরে দিলেন। যা বললেন তার সারাংশ এমন–
যদি তার নিজের ভাষায় বলি তো—–
এই মেয়েমানষের বাড়াবাড়ির জন্যিই দুনিয়াডা রসাতলে গেল। ইরা এখন জজ ব্যারিস্টার, মন্ত্রী মিনিস্টার হয়ে মাথা কিনে নিয়েছে। একসময় স্বামীগের দেখলিই বউরা ভয়ে থরথর করে কাঁপতো। চোখির দিকি তাকানোর সাহস ছিল না মুখি মুখি কতা কওয়া তো দূরির কথা। আর একন স্বামীরা হইচে এক একটা সব বুকার হদ্দ মোদোর মা, না আছে চ্যাত না আছে বোধ। একটা কতা বললি বউরা পাঁচটা শুনায়ে ছাড়ছে। ইরা বিটাগুলোরে একদম বুকার দড়ি মেঝের মাটি খাওয়ায় থুইছে মুখি কোন কতা নেই। উঠতি কলি ওটে আর বসতি কলি বসে। আমাগের সময় আমরা সংসারের কত কাজ করিচি, এক এক পাল ছেলেপেলে মানুষ করিচি আর একন এট্টা হতিই সব আহ্লাদে বাচে না। কি আল্লাদ যে হয়ছেরে নানী মনে কয় *–তারটারেও যেন বাপের বাড়িত্তে নিয়াইচে, আমার ছেলের পরে আমার কোন অধিকার নেই! আমি কোন কতা কতি পারবো না! ছেলেডা তোর মা বানাইলো না আমি বানাইলাম, অত বড় করিল কিডা হ্যা! সেকালে আমরা কত কষ্ট করিচি, কত অভাব ছিল, দুটো শাড়ী পরে বচর উটোয় দিচি আর এগের কিচুতি আগায়ই না। যা চাচ্ছে তাই এনে দেচ্চে *তারে, খাওয়া পরা মাখা কোনকিছুর অভাব নেই, এত আরামেও পরাণ ভরে না৷…….. ইত্যাদি ইত্যাদি…..

উপরোক্ত কথাগুলোর আমি শুধু নির্বাক শ্রোতা। চলতে পথে এরকম অসংখ্য জীবনের গল্প শুনি, এমন হাজারো গল্প জড়িয়ে আছে প্রতি পায়ে পায়ে। এই জন্যই একে গল্প বলি যে এগুলো আমাদের বাহিত সময়। যাপিত জীবনের গল্প। আপাতদৃষ্টিতে শুনলে মনে হয় এখনই কোন প্রতিকার করি বা করার চেষ্টা করি কিন্তু বাস্তবে তাৎক্ষণিক এর কোন সমাধান নেই। চলমান সময়ের ধারাবাহিকতায় হয়ত পরিবর্তন আসবে। সেই পরিবর্তনে নারীর প্রতি সহিংসতাও পরিবর্তিত হবে, ‘যা আমরা দেখতে পাই’ (নির্যাতনের ধরণ পাল্টাচ্ছে) নাকি নারী সমমর্যাদা পাবে তা নির্ভর করছে আমাদের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার দৃষ্টিভঙ্গির উপর। শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, সম্পত্তি ও অধিকারের জায়গা গুলোতে নারী যত বেশি সম্পৃক্ত হবে তত তাড়াতাড়ি মুক্তি পাবে সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন এইরকম শৃঙ্খলবদ্ধ পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে।
এরকম গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হয়েছে বা প্রশ্নও করেছি যে এখন তো আপনার স্বামীর বয়স হয়েছে চাইলেই মারতে পারবে না। ছেলেমেয়েরা বড় বড় আপনি প্রতিবাদ করেন না কেন? যতজনকে প্রশ্নটা করেছি একই উত্তর, আঁতকে ওঠেন। “ওরে বাবা তুমি তো জানো না কি মুখ”। আমি না জানলেও বুঝি সমস্যাটা আসলে অভ্যাসে

আমি না জানলেও বুঝি সমস্যাটা আসলে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। উনারা ভুলেই গেছেন এর বাইরে আর কিছু হতে পারে। সেই খুঁটোয় বাধা হাতির মতন উনারা একই বৃত্তে ঘুরতে থাকেন আজীবন।
এ লেখার শেষ নেই, আদৌও কোনদিন শেষ হবে কিনা আমার জানা নেই। তবে এখানে এখন শেষ করি।